কলকাতা | ১২ জানুয়ারি | SE News বিশেষ প্রতিবেদন:
আজ স্বামী বিবেকানন্দের জন্মবার্ষিকী। ভারতীয় ইতিহাসে এমন খুব কম মনীষী আছেন, যাঁরা মাত্র ৩৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে একটি জাতির চিন্তা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎদর্শনকে আমূল বদলে দিতে পেরেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর কণ্ঠে ভারত নিজেকে চিনেছিল, নিজের শক্তিকে উপলব্ধি করেছিল।
জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন কলকাতার সিমলা স্ট্রিটে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং যুক্তিবাদী চিন্তক। মাতা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও সংস্কৃতিমনস্ক। এই দুই বিপরীত ধারার সংমিশ্রণই নরেন্দ্রনাথের চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
শৈশব ও শিক্ষা জীবন
শৈশব থেকেই নরেন্দ্রনাথ ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী, সঙ্গীতপ্রিয় ও প্রশ্নবাণে দক্ষ। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং পরে জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করার সময় পাশ্চাত্য দর্শন, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ তাঁর চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। তবে তাঁর মনের গভীরে ছিল এক অদম্য প্রশ্ন—“ঈশ্বর কি সত্যিই আছেন?”
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্য
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি পৌঁছন দক্ষিণেশ্বরে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে। গুরু ও শিষ্যের এই সম্পর্ক নরেন্দ্রনাথের জীবনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। রামকৃষ্ণদেব তাঁকে শিখিয়েছিলেন—ধর্ম মানে শুধু আচার নয়, মানবপ্রেম ও সেবাই প্রকৃত সাধনা।
সন্ন্যাস ও ভারত ভ্রমণ
গুরুর তিরোধানের পর নরেন্দ্রনাথ সন্ন্যাস গ্রহণ করে স্বামী বিবেকানন্দ নামে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ভারত পরিক্রমা। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত পদযাত্রায় তিনি দেখেন ভারতের দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে এক দৃঢ় সংকল্পে পৌঁছায়—ভারতের পুনর্জাগরণ না হলে আধ্যাত্মিক মুক্তিও অসম্পূর্ণ।
শিকাগো ভাষণ: ভারতের আত্মপ্রকাশ
১৮৯৩ সালে শিকাগোতে বিশ্ব ধর্ম সংসদে স্বামী বিবেকানন্দের ভাষণ ছিল ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। তাঁর কণ্ঠে ভারত প্রথমবার বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। তিনি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, মানবিকতা ও বেদান্ত দর্শনের সারমর্ম তুলে ধরেন।
এই ভাষণ কেবল ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ভারতের আত্মসম্মান পুনর্গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে।
দর্শন ও আদর্শ
স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল—
আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তি
মানবসেবাকে ঈশ্বরসেবা হিসেবে দেখা
নারীশক্তির জাগরণ
শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্র গঠন
যুব সমাজকে জাতি গঠনের মূল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা
তিনি বিশ্বাস করতেন, দুর্বলতা সবচেয়ে বড় পাপ এবং সাহসই মুক্তির পথ।
রামকৃষ্ণ মিশন: কর্মযোগের বাস্তব রূপ
১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশন আজও শিক্ষা, চিকিৎসা, দুর্যোগ ত্রাণ ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এই প্রতিষ্ঠান স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগ দর্শনের জীবন্ত প্রতিফলন।
জাতীয় চেতনা ও প্রভাব
স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে নিজের আধ্যাত্মিক গুরু বলে উল্লেখ করেছিলেন। গান্ধীজি থেকে শুরু করে অগণিত বিপ্লবী ও চিন্তাবিদ তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হন।
জাতীয় যুব দিবস
স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়। তাঁর বাণী আজও যুব সমাজকে পথ দেখায়—স্বপ্ন দেখতে শেখায়, দায়িত্ব নিতে শেখায়।
SE News-এর শ্রদ্ধাঞ্জলি
স্বামী বিবেকানন্দ শুধু একজন সন্ন্যাসী নন, তিনি ছিলেন এক দার্শনিক, সমাজসংস্কারক, শিক্ষক ও জাতি নির্মাতা। তাঁর জীবন আজও আমাদের শেখায়—নিজেকে জানো, মানুষকে ভালোবাসো, এবং নির্ভীক হয়ে সত্যের পথে এগিয়ে চলো।
স্বামী বিবেকানন্দের জন্মবার্ষিকীতে SE News তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এই অঙ্গীকার করে—তাঁর আদর্শকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার।
“একটি ভাব গ্রহণ করো, সেটিকে নিজের জীবন করে তোলো—এই ভাবনাই তোমাকে মহান করবে।”