পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ, বাদুর ছাড়াও মানব ও প্রাণী থেকে ছড়ানোর আশঙ্কা—উদ্বিগ্ন প্রশাসন

কলকাতা:
পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের হদিশ মিলতেই রাজ্যজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুইজন নার্স চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এই খবর সামনে আসতেই পরিস্থিতি নিয়ে তৎপর হয়েছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। পাশাপাশি, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে কেন্দ্রও। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা রাজ্য সরকারকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, আক্রান্তদের অবস্থা স্থিতিশীল হলেও তাঁদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল চত্বরে সংক্রমণ ছড়ানো রুখতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সংক্রমণের উৎস এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজও শুরু হয়েছে।
নিপা ভাইরাস (Nipah Virus) একটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী ভাইরাস হিসেবে পরিচিত, যা মানুষের মধ্যে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। সাধারণভাবে এই ভাইরাস ফলখেকো বাদুরের মাধ্যমে ছড়ায় বলে জানা থাকলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে সংক্রমণের পথ শুধুমাত্র বাদুরেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর একাধিক মাধ্যম রয়েছে।
চিকিৎসা গবেষণা অনুযায়ী, নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়াতে পারে সরাসরি সংস্পর্শ, কাশি, হাঁচি বা দেহের তরল পদার্থের মাধ্যমে। বিশেষ করে হাসপাতাল বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। অতীতে বাংলাদেশ এবং ভারতের একাধিক রাজ্যে নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় মানব থেকে মানব সংক্রমণের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
এছাড়াও, বিভিন্ন পশু যেমন শূকর বা গবাদি পশু এই ভাইরাসের মধ্যবর্তী বাহক হতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। যদি কোনও পশু ভাইরাসযুক্ত খাবার গ্রহণ করে বা সংক্রমিত বাদুরের সংস্পর্শে আসে, সেক্ষেত্রে সেই পশুর মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে মানুষ ও পশুর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ স্বাভাবিক, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ এড়ানো অত্যন্ত জরুরি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালগুলিকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নির্দেশিকা মেনে চলার কথাও বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপা ভাইরাস সংক্রমণ শুধুমাত্র বাদুরের মাধ্যমেই ছড়ায়—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। মানব থেকে মানব এবং পশু থেকে মানব সংক্রমণের সম্ভাবনাও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল সচেতনতা, সঠিক তথ্য এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের খবর জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য দফতর। আগামী দিনে সংক্রমণ যাতে আর না ছড়ায়, সে জন্য রাজ্য ও কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

About the Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these