আতশবাজি থেকে ছাপাখানা—কেন তামিলনাড়ুর শিবকাশীকে বলা হয় ভারতের ‘মিনি জাপান’?

চেন্নাই:
ভারতের মানচিত্রে ছোট্ট একটি শহর, কিন্তু শিল্প সাফল্যের নিরিখে যার নাম আজ গোটা দেশে পরিচিত—তামিলনাড়ুর শিবকাশী। আতশবাজির রাজধানী হিসেবে খ্যাত এই শহরকে অনেকেই ডাকেন ভারতের ‘মিনি জাপান’ নামে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন এমন নাম? এর নেপথ্যে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী শিল্প সংস্কৃতি ও আত্মনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো।

আতশবাজির শহর শিবকাশী

শিবকাশী মূলত পরিচিত দেশের সবচেয়ে বড় আতশবাজি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ আতশবাজি এই শহর থেকেই তৈরি হয়। দীপাবলি হোক বা অন্য কোনও উৎসব—দেশের প্রতিটি প্রান্তে যে রঙিন আলো পৌঁছে যায়, তার বড় অংশের উৎস এই শিবকাশী।

ম্যাচ ও প্রিন্টিং শিল্পেও অগ্রগামী

আতশবাজির পাশাপাশি শিবকাশী দেশের অন্যতম বড় সেফটি ম্যাচ এবং প্রিন্টিং শিল্প কেন্দ্র। দেশের মোট ম্যাচবক্স উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখান থেকেই আসে। শুধু তাই নয়, আধুনিক ছাপাখানা শিল্পে শিবকাশীর অবদান উল্লেখযোগ্য। বই, ক্যালেন্ডার, প্যাকেজিং সামগ্রী—সব ক্ষেত্রেই এখানকার প্রিন্টিং ইউনিটের চাহিদা রয়েছে সারা দেশে।

‘মিনি জাপান’ নামের পেছনের গল্প

শিবকাশীকে ‘মিনি জাপান’ বলা হয় মূলত এখানকার মানুষের শিল্পমনস্কতা, শৃঙ্খলা ও উৎপাদন দক্ষতার জন্য। ছোট শহর হলেও এখানকার শিল্প উদ্যোগীরা স্বনির্ভরভাবে কাজ করে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। জাপানের মতোই এখানে ছোট ছোট ইউনিট, নিরলস পরিশ্রম আর প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাধারার মেলবন্ধন দেখা যায়।

ষাটের দশক থেকে শিল্পযাত্রা

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিবকাশীর শিল্প সাফল্যের যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে। সেই সময়ে স্থানীয় উদ্যোগীরা সীমিত সম্পদ নিয়েই আতশবাজি ও ম্যাচ শিল্প গড়ে তুলতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগই আজকের বিশাল শিল্পাঞ্চলের রূপ নিয়েছে।

লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান

শিবকাশীর শিল্পাঞ্চল আজ শুধু উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, এটি লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার উৎস। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অসংখ্য পরিবার এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল। স্থানীয় অর্থনীতিতে শিবকাশীর অবদান তামিলনাড়ুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশ সচেতনতার পথে শিল্প

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিবকাশীর শিল্পও বদলেছে। পরিবেশ দূষণ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে এখন এখানে ‘গ্রিন ক্র্যাকার’ উৎপাদনের দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে কীভাবে শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই চেষ্টাই এখন মূল লক্ষ্য।

শিল্প সংস্কৃতির অনন্য উদাহরণ

শিবকাশী প্রমাণ করে দিয়েছে, বড় শহর বা বিপুল পরিকাঠামো ছাড়াও কীভাবে একটি ছোট শহর শিল্প ও অর্থনীতির মডেল হয়ে উঠতে পারে। কঠোর পরিশ্রম, উদ্যোগী মানসিকতা এবং সমবায় সংস্কৃতির জোরেই এই শহর আজ ‘মিনি জাপান’ নামে পরিচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these