নয়াদিল্লি / কলকাতা:
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হল। ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দিল্লিতে নির্ধারিত বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বৈঠক বয়কট করেন। পরে তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন এবং প্রকাশ্যে গণআন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision – SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি দল এবং এমন কয়েকটি পরিবার, যাদের নাম নাকি ভুলভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে কেন সমাধান হল না
সূত্রের খবর, নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকারের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং একাধিক প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই বৈঠকের মাঝপথে তিনি সরে আসেন।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এমন ব্যবহার তিনি আগে কখনও দেখেননি। তাঁর অভিযোগ, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়েও নির্বাচন কমিশনের আচরণ ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসম্মানজনক।
“আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছি”—মমতার কড়া বার্তা
মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার খর্ব হলে তিনি এক লক্ষ মানুষ নিয়ে আন্দোলনে নামতে পারেন। তাঁর বক্তব্য, এটি কোনও রাজনৈতিক দলের লড়াই নয়, বরং গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিশানা করা হচ্ছে এবং ভোটার তালিকায় গরমিল করে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, SIR প্রক্রিয়ার ফলে বহু প্রকৃত ভোটারের নাম বেআইনিভাবে বাদ পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক মানুষকে মৃত দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও নথির সামান্য অমিলের কারণেই ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।
এই সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, ভোটের ঠিক আগে এই ধরনের কাজ স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দেয়।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের তরফে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগের বিস্তারিত জবাব এখনও দেওয়া হয়নি। তবে কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ সংবিধান ও আইন মেনেই করা হচ্ছে। দাবি ও আপত্তি জানানোর জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াও চালু রয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে রাজনীতিকরণ না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য প্রভাব
এই ঘটনার পর রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থানকে সমর্থন করলেও বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েনকেই তুলে ধরছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে এই ইস্যু আরও বড় আকার নিতে পারে।
উপসংহার
নির্বাচন কমিশন ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব কীভাবে মিটবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে একথা নিশ্চিত, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক আগামী দিনে রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে চলেছে।