SIR ইস্যুতে দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা

নয়াদিল্লি/কলকাতা:
ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া ঘিরে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আবারও সরব হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে বসার পর সেই বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। পরে দিল্লির বঙ্গভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, বাংলার ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে কোনও আপস করবে না তাঁর সরকার।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, SIR-এর নামে বাংলার সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে প্রকৃত ভোটারদের নাম ভুলভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও জীবিত ব্যক্তিদের মৃত দেখানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই প্রক্রিয়া শুধুমাত্র প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

“বাংলাকে টার্গেট করা হচ্ছে” — অভিযোগ মমতার

দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাংলাকে আলাদা করে নিশানা করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, দেশের অন্যান্য রাজ্যে যেখানে এই ধরনের কড়া সংশোধন প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না, সেখানে বাংলায় কেন এত বেশি চাপ দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই। তিনি বলেন, “বাংলা বহুভাষী ও বহুধর্মীয় রাজ্য। এখানকার মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন করা যাবে না।”

মুখ্যমন্ত্রীর আরও অভিযোগ, SIR-এর নামে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের উপর বাড়তি নজরদারি চালানো হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

নির্বাচন কমিশনের বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসা

সোমবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বৈঠকের মধ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বৈঠক ত্যাগ করেন। তাঁর অভিযোগ, কমিশনের তরফে তাঁর বক্তব্য শোনার মানসিকতা দেখা যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি একাধিক নির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে দেশের গণতন্ত্র বিপদের মুখে পড়বে।

দিল্লিতে নিরাপত্তা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ

SIR ইস্যু ছাড়াও দিল্লিতে অবস্থানকালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পুলিশের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, বঙ্গভবনের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সাধারণ মানুষকে জেরা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা চাইলে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে পারতাম, কিন্তু আমরা আইন মেনেই প্রতিবাদ করছি।”

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তিনি শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পথেই লড়াই চালাতে চান। তবে বাংলার মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে যদি কোনও ষড়যন্ত্র হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যেতে তিনি পিছপা হবেন না।

রাজনৈতিক তাৎপর্য

রাজনৈতিক মহলের মতে, SIR ইস্যু ঘিরে কেন্দ্র ও রাজ্যের এই সংঘাত আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লিতে সরব উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই SIR ইস্যু জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে, দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান স্পষ্ট—ভোটার তালিকা নিয়ে কোনও অনিয়ম বা পক্ষপাত বরদাস্ত করা হবে না। এই লড়াই আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

About the Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these