আর জি কর দুর্নীতি মামলা: আলিপুর আদালতে আত্মসমর্পণ অভিযুক্ত আখতার আলির, ইডির চার্জশিটে নতুন মোড়

কলকাতা:
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের দুর্নীতি মামলায় বড়সড় আইনি অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত থাকার পর অবশেষে শনিবার আলিপুর বিশেষ আদালতে আত্মসমর্পণ করলেন মামলার অন্যতম অভিযুক্ত আখতার আলি। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) মামলায় তাদের প্রথম চার্জশিট পেশ করেছে, যা তদন্তকে আরও গভীর ও জটিল পর্যায়ে নিয়ে গেল।

আদালতে হাজিরা ও আত্মসমর্পণ

আখতার আলি, যিনি আর জি কর হাসপাতালের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ পদে কর্মরত ছিলেন, এর আগে একাধিকবার আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও হাজিরা দেননি। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি দীর্ঘদিন আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। তবে আদালত তাঁর এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অ-জামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

শনিবার সেই পরোয়ানা জারির পরেই আলিপুর আদালতে উপস্থিত হয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। আদালতে দাঁড়িয়ে আখতার আলি দাবি করেন, তিনি নির্দোষ এবং তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তাঁর আইনজীবীর পক্ষ থেকেও জানানো হয়, যথাযথ সময়ে তিনি জামিনের আবেদন করবেন।

ইডির চার্জশিটে কী অভিযোগ?

আখতার আলির আত্মসমর্পণের পাশাপাশি এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইডির দাখিল করা চার্জশিট। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ অনুযায়ী, আর জি কর হাসপাতালের একাধিক আর্থিক লেনদেনে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদারি কাজ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিভিন্ন পরিষেবার ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে।

চার্জশিটে হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ-সহ একাধিক ব্যক্তি ও সংস্থার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ইডির দাবি, এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অর্থ বিভিন্নভাবে ঘুরিয়ে এনে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সাদা করা হয়েছে।

কীভাবে শুরু হয় এই তদন্ত?

আর জি কর হাসপাতাল সংক্রান্ত দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসে ২০২৪ সালে, যখন হাসপাতাল ঘিরে একাধিক প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। সেই সময়ে আখতার আলি নিজেই কলকাতা হাইকোর্টে একটি আবেদন করেন, যেখানে তিনি হাসপাতালের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তের দাবি জানান।

এরপর আদালতের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তীতে আর্থিক লেনদেনের দিকটি সামনে আসায় ইডিও আলাদা করে তদন্তে নামে। তদন্ত যত এগোয়, ততই অভিযোগের পরিধি বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত আখতার আলিকেও অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

দ্বিমুখী তদন্তে জটিলতা বাড়ছে

বর্তমানে এই মামলায় একদিকে সিবিআই দুর্নীতির মূল দিকটি খতিয়ে দেখছে, অন্যদিকে ইডি আর্থিক অনিয়ম ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক আইনের অধীনে মামলা চলছে, যা তাঁদের আইনি অবস্থানকে আরও কঠিন করে তুলছে।

আইনজ্ঞদের মতে, আখতার আলির আত্মসমর্পণের ফলে তদন্তকারী সংস্থাগুলি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাবে এবং মামলার বহু অজানা দিক সামনে আসতে পারে।

জনস্বার্থ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

সরকারি হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে—এই মত বহু নাগরিক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের। তাই এই মামলার দ্রুত ও স্বচ্ছ নিষ্পত্তির দাবিও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

আলিপুর আদালতে আগামী দিনে আখতার আলির জামিন আবেদন, হেফাজতের মেয়াদ এবং চার্জশিট সংক্রান্ত শুনানি মামলার ভবিষ্যৎ দিশা নির্ধারণ করবে। তদন্তকারী সংস্থার তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনে আরও চার্জশিট পেশ করা হতে পারে।

আর জি কর দুর্নীতি মামলা এখন শুধু একটি হাসপাতালের অনিয়মের প্রশ্ন নয়, বরং রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these