ইসলামাবাদ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। জাতীয় পরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে “টয়লেট পেপারের চেয়েও খারাপভাবে ব্যবহার করেছে।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক মহল থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন— সর্বত্র শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
সংসদে কড়া ভাষায় আত্মসমালোচনা
জাতীয় পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে খাজা আসিফ স্বীকার করেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন এবং বিশেষ করে আফগান যুদ্ধের সময় মার্কিন অবস্থানের পাশে দাঁড়ানো পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ভুল ছিল। তাঁর দাবি, সে সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব আজও দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়ছে।
মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান বহুবার আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু প্রয়োজন শেষ হলে সেই শক্তিগুলো পাকিস্তানকে একা ফেলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা তাদের স্বার্থ রক্ষা করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।”
‘জিহাদ’ বর্ণনার সমালোচনা
বক্তৃতায় খাজা আসিফ অতীতে আফগান যুদ্ধকে ‘জিহাদ’ হিসেবে তুলে ধরার রাজনৈতিক বর্ণনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, জনগণকে ধর্মীয় আবেগের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক সংঘাতে যুক্ত করা হয়েছিল, যার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এখনো দেশকে ভুগতে হচ্ছে।
তাঁর মতে, সেই সময়ের সিদ্ধান্তগুলো শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক ছিল না— বরং তা দেশের অভ্যন্তরীণ সমাজব্যবস্থা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে এই নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর সম্পর্ক রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আফগান যুদ্ধ ও পরবর্তী পরিস্থিতি
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে শুরু হওয়া যুদ্ধের সময় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের ভূমিকা পালন করে। লজিস্টিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনের পাশে ছিল।
কিন্তু খাজা আসিফের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পর পাকিস্তান এক জটিল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। সীমান্তে অস্থিরতা, জঙ্গি হামলা বৃদ্ধি এবং শরণার্থী সমস্যা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
খাজা আসিফের এই মন্তব্যকে কেউ কেউ সাহসী আত্মসমালোচনা হিসেবে দেখছেন, আবার বিরোধী শিবিরের একাংশ মনে করছে এটি কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। বিশ্লেষকদের মতে, এমন কড়া ভাষা সাধারণত উচ্চপর্যায়ের সরকারি বক্তব্যে দেখা যায় না, বিশেষ করে যখন বিষয়টি একটি প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বর্তমান অভ্যন্তরীণ চাপে সরকার অতীতের নীতিগত ভুল তুলে ধরে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এটি দেশের জনগণের মধ্যে প্রচলিত মার্কিন-বিরোধী মনোভাবের প্রতিফলনও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বরাবরই ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। একদিকে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, অন্যদিকে পারস্পরিক অবিশ্বাস— এই দ্বৈত অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাজা আসিফের বক্তব্য ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি স্পষ্ট যে পাকিস্তানের ভেতরে বিদেশনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
উপসংহার
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্য শুধু একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়— বরং অতীতের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনার ইঙ্গিত বহন করছে। আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত— সে প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
এখন দেখার বিষয়, এই বক্তব্যের পর পাকিস্তান-মার্কিন সম্পর্ক কোন পথে এগোয় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর কী প্রভাব পড়ে।