নয়াদিল্লি: প্রশাসনিক ও সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত সমস্ত কর্মসূচিতে এবার থেকে জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বা বাজানো বাধ্যতামূলক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা একটি নির্দেশিকা ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক। নির্দেশে বলা হয়েছে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আওতায় আয়োজিত বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে নিয়মিতভাবে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করতে হবে।
নির্দেশিকার মূল কথা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নোটিস অনুযায়ী, প্রশাসনিক সভা, সরকারি অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণী, পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরকারি কর্মসূচিতে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গানটি চলাকালীন উপস্থিত সকলকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
এছাড়া নির্দেশে জানানো হয়েছে, যদি কোনও অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’ ও ‘বন্দে মাতরম’— দুটিই পরিবেশন করা হয়, সেক্ষেত্রে প্রথমে ‘বন্দে মাতরম’ এবং পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হবে।
ছয় স্তবক গাওয়ার নির্দেশ
এই নির্দেশিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম ছয়টি স্তবক সম্পূর্ণভাবে গাওয়ার নির্দেশ। এতদিন সরকারি অনুষ্ঠানে সাধারণত প্রথম দুটি স্তবকই পরিবেশন করা হত। নতুন নির্দেশে সেই প্রথায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য জাতীয় ঐতিহ্য ও ঐক্যের চেতনাকে আরও জোরদার করা।
কোথায় প্রযোজ্য, কোথায় নয়
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে,
সরকারি ও প্রশাসনিক অনুষ্ঠানে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরকারি কর্মসূচিতে
রাষ্ট্রপতি বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকেন এমন অনুষ্ঠানে
পদ্ম পুরস্কার সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে
এই নিয়ম কার্যকর হবে।
তবে সিনেমা হল বা চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্রে গানটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যা
কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ‘বন্দে মাতরম’-এর গুরুত্ব অপরিসীম। জাতীয় চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেমের ভাবনা জাগ্রত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্রের খবর, ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষেই এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
শুরু বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া
নির্দেশ জারির পর থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একাংশ এই সিদ্ধান্তকে জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিরোধী শিবিরের দাবি, জাতীয় প্রতীক ব্যবহারে সংবেদনশীলতা ও সাংবিধানিক ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ব্যাঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত ‘বন্দে মাতরম’ স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেয়েছিল। পরবর্তীকালে সংবিধান অনুযায়ী ‘জন গণ মন’ জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত হলেও ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পায়।
উপসংহার
সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার এই সিদ্ধান্ত জাতীয় পরিচয় ও ঐতিহ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে। আগামী দিনে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন কতটা নির্বিঘ্ন হয় এবং রাজনৈতিক বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর দেশবাসীর।