মা নেই, অটোতেই ঘুমায় ছোট্ট মেয়ে — জীবনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এক অটোরিকশা চালক বাবা

জীবন কখনও কখনও এমন কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে প্রতিদিনই লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। তেমনই এক হৃদয়বিদারক বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে এক অটোরিকশা চালক বাবার জীবনে। মা হারানো ছোট্ট মেয়েকে নিয়েই এখন তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রাম—অটোর সামনের সিটে বাবা স্টিয়ারিং ধরেন, আর পেছনের সিটেই ঘুমিয়ে পড়ে মেয়ে।

জানা গেছে, কিছুদিন আগেই অসুস্থতার কারণে মারা যান ওই চালকের স্ত্রী। সংসারের সব দায়িত্ব এক মুহূর্তে এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। বাড়িতে ছোট্ট মেয়ের দেখাশোনার মতো আর কেউ নেই। আত্মীয়স্বজন থাকলেও নিয়মিতভাবে দেখভাল করার মতো পরিস্থিতি কারও নেই। ফলে বাধ্য হয়েই মেয়েকে সঙ্গে নিয়েই কাজে বের হন তিনি।

প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেয়েকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বাবা। অটোর পেছনের অংশে, যেখানে সাধারণত গ্যাস সিলিন্ডার বা যাত্রীদের লাগেজ রাখা হয়, সেখানেই ছোট্ট একটা বিছানার মতো ব্যবস্থা করেছেন তিনি। একটি পাতলা কম্বল, ছোট বালিশ—এই সামান্য ব্যবস্থাতেই সারাদিন কাটে শিশুটির। কখনও যাত্রী ওঠানামার শব্দে ঘুম ভাঙে, আবার কখনও বাবার কণ্ঠ শুনেই নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে দেয় সে।

চালক বাবার কথায়, “মেয়েকে বাড়িতে একা রেখে যাওয়ার সাহস পাই না। ও এখনো খুব ছোট। তাই সঙ্গে নিয়েই বেরোই। কষ্ট হয়, কিন্তু ওকে মানুষ করতেই হবে।” কথাগুলো বলতে বলতেই চোখ ভিজে ওঠে তাঁর। দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে অটো চালিয়ে চলেছেন তিনি, শুধু মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত। কেউ কেউ মাঝে মাঝে খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তবে নিয়মিত কোনও সরকারি সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের সুবিধা তিনি এখনও পাননি বলে জানা গেছে। আর্থিক অনটনের মধ্যেই চলছে বাবা-মেয়ের জীবনযুদ্ধ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একক অভিভাবকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তা ব্যবস্থার আরও জোরদার হওয়া জরুরি। শিশুর সুরক্ষা, শিক্ষা ও পুষ্টির দিকটি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। এই ঘটনাটি সমাজের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে—অসহায় পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।

তবে সমস্ত কষ্টের মাঝেও আশার আলো হারাননি ওই বাবা। তাঁর একটাই স্বপ্ন—মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে ভালো মানুষ করে তোলা। “ও পড়াশোনা করবে, বড় হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে—এই আশাতেই সব কষ্ট সহ্য করি,” দৃঢ় কণ্ঠে জানান তিনি।

মা নেই, তবু বাবার বুকের ভরসাতেই ঘুমিয়ে পড়ে ছোট্ট মেয়ে। অটোর চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে তাদের জীবনের চাকা—কঠিন, অনিশ্চিত, তবু লড়াই থামেনি। এই অটোরিকশা চালকের গল্প নিঃসন্দেহে চোখে জল এনে দেয়, আবার একই সঙ্গে শেখায় অদম্য সাহস ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ।

About the Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these