উত্তর ২৪ পরগনা: মোবাইল, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটে যখন গ্রামবাংলার চিরাচরিত লোকসংস্কৃতি ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত গ্রামে যাত্রাপালাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অভিনব সাংস্কৃতিক আন্দোলন। লক্ষ্য একটাই—গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া।
উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের দুলদুলি এলাকায় কয়েক দশক ধরে নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে যাত্রাপালা। স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের উদ্যোগে এই ঐতিহ্য আজও টিকে রয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রায় ৩৬ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে একই নাট্যদল এই যাত্রাপালার আয়োজন করে আসছে। প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে গ্রামের মাঠে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে বসে জমজমাট আসর।
বর্তমানে যেখানে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন, সেখানে রাতভর যাত্রাপালার আসরে মানুষের ভিড় সত্যিই বিস্ময় জাগায়। পৌরাণিক কাহিনি, সামাজিক বার্তা ও লোকজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি নাটকগুলো এখনও গ্রামবাসীর আবেগকে ছুঁয়ে যায়। বিশেষ করে ‘দুর্যোধনের বিচার চাই’ নামের একটি পালা দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
উদ্যোক্তাদের কথায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতার কারণে গ্রামের কিশোর-যুবকদের বড় অংশ এখন আর যাত্রা বা লোকনাট্যের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। ফলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই স্থানীয়রা সচেতনভাবে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের নিয়ে কর্মশালা, অভিনয় প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক শিবিরের আয়োজন করা হচ্ছে।
সংগঠনের এক কর্ণধার জানান, “যাত্রাপালা শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক। সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রা, সংগ্রাম ও বিশ্বাসের প্রতিফলন এই মঞ্চে ফুটে ওঠে। তাই আমরা চাই এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতেও পৌঁছে যাক।”
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় যাত্রাপালাই ছিল গ্রামীণ সমাজের প্রধান বিনোদন। বিদ্যুৎবিহীন রাতেও হারিকেনের আলোয় চলত নাটক, আর হাজার মানুষ মগ্ন হয়ে শুনত সংলাপ ও গান। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও দুলদুলির এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে—সঠিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এমন উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বিনোদন নয়, সামাজিক ঐক্য ও ঐতিহ্যের বন্ধনকেও মজবুত করে। পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে এর সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জের মুখেও সুন্দরবনের এই যাত্রাপালা যেন এক আলোর দিশা দেখাচ্ছে। প্রমাণ করছে—প্রযুক্তি যতই এগোক, শিকড়ের টান কখনও পুরোপুরি মুছে যায় না। ঐতিহ্য রক্ষায় এই লড়াই কতদূর এগোয়, এখন সেদিকেই নজর সংস্কৃতিপ্রেমীদের।