আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ল ভারতীয় শেয়ার বাজারে। ইরান-আমেরিকা সংঘাত ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝেই বড়সড় ধস নামল বাজারে। সপ্তাহের শুরুতেই ব্যাপক বিক্রির চাপে একসময় প্রায় ১,৫০০ পয়েন্ট পর্যন্ত পড়ে যায় BSE Sensex। একইসঙ্গে চাপের মুখে পড়ে Nifty 50-ও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পতন শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কারণে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা ও তেলের দামের উর্ধ্বগতির জেরে বাজারে আতঙ্কজনিত বিক্রি বেড়েছে।
কেন ধস নামল বাজারে?
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাড়তে থাকা সংঘাত বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকিভীতি তৈরি করেছে। সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা এবং তার প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা থেকেই বাজারে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
ভারত যেহেতু বড় তেল আমদানিকারক দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশের অর্থনীতির উপর সরাসরি চাপ পড়ে। জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেতে পারে, যার প্রভাব কর্পোরেট আয় এবং সামগ্রিক বাজারের ওপর পড়ে।
কোন খাতে বেশি প্রভাব?
ব্যাংকিং, আইটি, অটো এবং ধাতু খাতে সবচেয়ে বেশি চাপ লক্ষ্য করা গেছে। বড় বড় ব্লু-চিপ শেয়ারেও বিক্রির চাপ ছিল প্রবল। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (FII) বড় অঙ্কের বিক্রির ফলেও বাজারে পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত।
বিশেষ করে জ্বালানি-নির্ভর শিল্প এবং আমদানি নির্ভর সংস্থাগুলির শেয়ার তুলনামূলকভাবে বেশি চাপে পড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের কতটা ক্ষতি?
বাজারে এই আকস্মিক পতনের ফলে বিনিয়োগকারীদের লক্ষ-কোটি টাকার সম্পদমূল্য কমে গেছে। খুচরো বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেই স্বল্পমেয়াদি লোকসানের আশঙ্কায় শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেছেন।
তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিলেও আতঙ্কে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথা বলছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এটি মূলত ভূরাজনৈতিক ঘটনাজনিত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাজারও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় বা আরও তীব্র হয়, তাহলে বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে।
অনেকে এটিকে ‘কারেকশন ফেজ’ হিসেবেও দেখছেন, যেখানে অতিরিক্ত উচ্চ মূল্যায়নের পরে বাজার সাময়িকভাবে নিচে নামছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি
শুধু ভারত নয়, এশিয়ার একাধিক বাজারেও পতনের প্রবণতা দেখা গেছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা ও মার্কিন ডলারের দিকে ঝুঁকছেন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা। এতে ইক্যুইটি বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
সামনে কী?
বাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমলে এবং তেলের দাম স্থিতিশীল হলে বাজারে আস্থা ফিরতে পারে। অন্যদিকে পরিস্থিতি খারাপ হলে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে ওঠানামা থাকলেও ভারতের মৌলিক অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনও স্থিতিশীল। তাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল বজায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।
বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, আতঙ্কিত না হয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক সূচকগুলির উপর নজর রাখুন এবং প্রয়োজন হলে আর্থিক উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিন।