মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। যুদ্ধের আশঙ্কা ঘিরে উদ্বেগের মধ্যে দুবাইয়ে আটকে পড়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর এলাকার কয়েকজন যুবক। তাঁদের পরিবার এখন গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। ফোনে মাঝেমধ্যে কথা হলেও পরিস্থিতি কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাগর ব্লকের একাধিক যুবক কয়েক মাস আগে কাজের সন্ধানে দুবাইয়ে গিয়েছিলেন। কেউ নির্মাণ সংস্থায় কাজ করেন, কেউ আবার হোটেল বা পরিষেবা ক্ষেত্রে যুক্ত। সাধারণভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে বহু ভারতীয় শ্রমিক যেমন থাকেন, তেমনই এই যুবকেরাও নিজের পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁদের জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
যুদ্ধের আশঙ্কায় উদ্বেগ
গত কয়েকদিন ধরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার খবর সামনে আসছে। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং পাল্টা হামলার খবর প্রকাশ্যে আসতেই মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই দুবাইয়ে থাকা প্রবাসী ভারতীয়দের পরিবারও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
সাগরের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, তাঁদের ছেলেরা ফোনে জানিয়েছে যে দুবাইয়ে এখনো সরাসরি কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি, তবে পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা অস্বস্তি কাজ করছে। অনেক জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং কর্মস্থলেও সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে।
পরিবারের উৎকণ্ঠা
গ্রামে থাকা পরিবারের সদস্যদের কথায়, প্রতিদিন খবরের চ্যানেল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দেখেই আতঙ্ক বাড়ছে। তাঁদের একমাত্র ভরসা ছেলেদের ফোন। কিন্তু সবসময় যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না।
একজন যুবকের বাবা জানান, “ছেলে ফোন করে বলেছে এখনো কাজ করছে, কিন্তু সবাই খুব চিন্তায় আছে। আমরা এখানে বসে শুধু খবর দেখছি আর অপেক্ষা করছি।”
আরেকজনের মা বলেন, “ওরা তো সংসারের জন্যই বিদেশে গেছে। এখন যদি যুদ্ধ লাগে তাহলে কী হবে? শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি যেন সব ঠিক থাকে।”
বিদেশে কর্মরত বহু বাঙালি
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ কর্মসূত্রে থাকেন। বিশেষ করে নির্মাণ, পরিবহন, হোটেল এবং পরিষেবা খাতে ভারতীয় শ্রমিকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদা ও নদিয়ার অনেক যুবক কাজের খোঁজে দুবাই বা অন্য উপসাগরীয় দেশে যান।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি তাঁদের পরিবারগুলির উপর পড়ে। কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সংঘর্ষের খবর এলেই গ্রামেগঞ্জে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে পরিবার
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ মনে করছেন যে পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে ভারত সরকার বিদেশে আটকে পড়া নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
সাগরের বাসিন্দারা বলছেন, প্রয়োজনে সরকার যেন দ্রুত যোগাযোগ করে তাঁদের ছেলেদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করে। যদিও আপাতত কোনো সরকারি নির্দেশ বা সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি, তবুও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে।
যোগাযোগের চেষ্টা
পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাঁদের ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ ভিডিও কলের মাধ্যমেও কথা বলছেন। তাতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “যতক্ষণ না পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হচ্ছে, ততক্ষণ এই দুশ্চিন্তা থেকেই যাবে।”
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির পর সেই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে শুধু ওই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের উপর পড়তে পারে। ফলে ওই অঞ্চলে থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
গ্রামে উদ্বেগের ছায়া
সাগর এলাকার বিভিন্ন গ্রামে এখন এক ধরনের উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা হলেই অনেক পরিবার একসঙ্গে বসে খবর দেখছেন এবং বিদেশে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় পঞ্চায়েতের এক সদস্য বলেন, “আমাদের গ্রামের কয়েকজন ছেলে দুবাইয়ে কাজ করে। আমরা নিয়মিত তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলছি। আশা করছি পরিস্থিতি খারাপ হবে না।”
আশার আলো
যদিও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তবুও অনেকেই আশা করছেন যে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমে যাবে। তাতে করে যুদ্ধের আশঙ্কাও দূর হবে এবং বিদেশে থাকা শ্রমিকরাও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন।
পরিবারগুলিও এখন সেই আশাতেই দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত হবে এবং তাঁদের ছেলেরা নিরাপদে কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।
অপেক্ষার প্রহর
এখন সব মিলিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই পরিবারগুলির দিন কাটছে উদ্বেগ আর অপেক্ষার মধ্যে। প্রতিদিন খবরের আপডেটের দিকে নজর রাখছেন তাঁরা। ফোন বেজে উঠলেই মনে আশা জাগে—হয়তো বিদেশে থাকা ছেলেরই খবর।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে আপাতত প্রার্থনা একটাই—যেন যুদ্ধ না হয় এবং বিদেশে থাকা সকল ভারতীয় নাগরিক নিরাপদে থাকতে পারেন।