মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতি বা নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং খাদ্যপণ্যের বাজারেও। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংঘাতের জেরে বহু দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তারই প্রভাব এবার পড়েছে ডিমের বাজারে। রপ্তানি কার্যত থমকে যাওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় ডিমের দাম কমতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিম আমদানি করে থাকে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পরিবহণ, বিমান চলাচল এবং বাণিজ্যিক রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যে পরিমাণ ডিম বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল, তার বড় অংশ এখন স্থানীয় বাজারেই থেকে যাচ্ছে। এর ফলেই বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম কমতে শুরু করেছে।
রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় চাপে পড়েছে পোলট্রি শিল্প
ডিম উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম বড় কেন্দ্র তামিলনাড়ুর নামাক্কল জেলা। এখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিম বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে এখানকার ডিম যায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেই রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ডিম দেশের বাজারেই থেকে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে এবং দাম কমে গেছে বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বড়সড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। কারণ উৎপাদন বন্ধ করা এত সহজ নয়। প্রতিদিনই ফার্মে ডিম উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু সেই ডিম বিদেশে পাঠানো না গেলে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিদিন কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা
শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহলের দাবি, রপ্তানি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে নামাক্কল অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েছেন।
কারণ এখানকার অনেক ব্যবসায়ী পুরোপুরি রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ডিমের চাহিদা সাধারণত বেশি থাকে। সেই বাজার বন্ধ হয়ে গেলে ব্যবসার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
এদিকে পরিবহণ ও রপ্তানি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ব্যবসায়ী নতুন চালান পাঠাতেও সাহস পাচ্ছেন না। কারণ পণ্য পাঠানোর পর যদি তা নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে বড় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।
গরমের মরসুমেও কমে চাহিদা
এই পরিস্থিতিতে আরেকটি বিষয়ও দাম কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমের মরসুমে সাধারণত ডিমের চাহিদা কিছুটা কমে যায়। অনেক জায়গায় গরমের সময় মানুষ তুলনামূলক কম ডিম খায়।
ফলে একদিকে যখন চাহিদা কিছুটা কম, অন্যদিকে রপ্তানি বন্ধ থাকায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে। এই দুই কারণ মিলেই দাম দ্রুত কমে যাচ্ছে।
উদ্বেগে খামার মালিকরা
পোলট্রি খামারের মালিকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে তাদের সমস্যায় পড়তে হবে। কারণ ডিম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত খরচ কিন্তু কমছে না।
মুরগির খাদ্য, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর খরচ আগের মতোই রয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম কমে গেলে লাভের বদলে লোকসানই বাড়তে থাকে।
অনেক খামার মালিক জানিয়েছেন, যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তাহলে উৎপাদন কমানোর কথা ভাবতে হতে পারে। তবে সেটাও সহজ সিদ্ধান্ত নয়, কারণ পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে।
নতুন বাজারের খোঁজে ব্যবসায়ীরা
রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসায়ী বিকল্প বাজার খোঁজার চেষ্টা করছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা আফ্রিকার কিছু দেশে ডিম রপ্তানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে হঠাৎ করে নতুন বাজার তৈরি করা সহজ নয়। সেখানে বাণিজ্যিক যোগাযোগ, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং চাহিদা—সবকিছুই নতুন করে গড়ে তুলতে হয়। তাই আপাতত সবাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রভাব সাধারণ বাজারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব শুধু কূটনীতি বা সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং খাদ্যপণ্যের দামের উপর।
ইরান-ইজরায়েল সংঘাতও তার ব্যতিক্রম নয়। এই সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বহু বাণিজ্যিক রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের আমদানি-রপ্তানির উপর প্রভাব পড়ছে।
দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় শিল্প
পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী এবং খামার মালিকরা আশা করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং রপ্তানি আবার শুরু হবে।
যদি মধ্যপ্রাচ্যের বাজার আবার খুলে যায়, তাহলে ডিমের দামও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে আপাতত পরিস্থিতি অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কেমন হয়, তার উপরই নির্ভর করছে ডিমের বাজারের ভবিষ্যৎ।
ফলে যুদ্ধের প্রভাব যে কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তারই এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে ডিমের এই বাজার পরিস্থিতি। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলিতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং তার প্রভাব বাজারে কতটা পড়ে।