মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পেও। ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে ওই অঞ্চলে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় একাধিক আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পরিবেশ ও বড় প্রযুক্তি কর্মীভাণ্ডারের কারণে ভারতের দিকে নজর বাড়ছে বহু সংস্থার।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বহু বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ অফিস, গবেষণা কেন্দ্র এবং ডেটা অপারেশন ইউনিট রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে এই সংস্থাগুলির অনেকেই তাদের ব্যবসার একটি অংশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সেই বিকল্প হিসেবে ভারতের নামই সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে।
বর্তমানে বিশ্বের বহু বড় প্রযুক্তি সংস্থা ভারতে তাদের গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার বা প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালনা করছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড পরিষেবা এবং গবেষণার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক সংস্থা তাদের বিদ্যমান কেন্দ্রগুলিকে আরও সম্প্রসারণের কথা ভাবছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে দক্ষ প্রযুক্তি কর্মীর বড় ভাণ্ডার রয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে খরচও অনেক কম। এর ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছে ভারত একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এছাড়া দেশের দ্রুত উন্নত হওয়া ডিজিটাল অবকাঠামো, স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেম এবং সরকারি উদ্যোগও প্রযুক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর কিছু সংস্থা ইতিমধ্যেই তাদের কর্মীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ সীমিত করেছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছে। নিরাপত্তা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তারা নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়নও শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
তবে প্রযুক্তি শিল্পের একাংশ মনে করছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। এতে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ কিছুটা ধীর হতে পারে এবং নতুন প্রকল্প শুরু হওয়ার ক্ষেত্রেও দেরি হতে পারে। ফলে পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অনেক সংস্থা সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।
তারপরও অনেক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে আরও বেশি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থা তাদের গবেষণা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ডেটা পরিচালনার কাজ ভারতের মতো স্থিতিশীল দেশে স্থানান্তর করার কথা ভাবতে পারে।
বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারতের আইটি ও প্রযুক্তি খাত ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এই নতুন পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
তবে একই সঙ্গে শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। তাই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কীভাবে এগোয় এবং বিশ্ব অর্থনীতির উপর তার প্রভাব কতটা পড়ে, তার উপরই ভবিষ্যতে প্রযুক্তি বিনিয়োগের দিক নির্ধারণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।