কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক লিফট দুর্ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই ঘটনায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, যদিও তাঁর পরিবারের আরও দুই সদস্য অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। ঘটনার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, এবং মৃতের পরিবার এই ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ।
জানা গিয়েছে, মৃত ব্যক্তি তাঁর ছোট ছেলের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন। চিকিৎসা শেষ করে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি হাসপাতালের ভবনের ভিতরে লিফটে ওঠেন। সেই সময় হঠাৎই লিফটে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয় এবং তারা তিনজন ভিতরে আটকে পড়েন। প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলেই মনে হচ্ছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভয়াবহ রূপ নেয়।
পরিবারের দাবি, লিফটে আটকে পড়ার পর তাঁরা বারবার সাহায্যের জন্য ডাকাডাকি করলেও দীর্ঘক্ষণ কোনও সাহায্য পৌঁছয়নি। এই অবস্থায় বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করতে গিয়ে ওই ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আচমকা লিফট চলতে শুরু করায় তিনি লিফটের দরজা ও দেওয়ালের মাঝে আটকে পড়েন এবং মারাত্মক চোট পান। পরে তাঁকে উদ্ধার করা হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
এই ঘটনার পর হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট লিফটে আগেও একাধিকবার প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তবুও সময়মতো মেরামত বা যথাযথ নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে এই ঘটনাকে এখন অনেকেই চরম গাফিলতির ফল বলেই মনে করছেন।
মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে, সময়মতো সাহায্য পৌঁছালে তাঁর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব ছিল। তাঁদের কথায়, হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এই ধরনের অব্যবস্থা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দায়িত্বে কারা ছিলেন—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে প্রকৃত কারণ সামনে আনা যায়।
এদিকে, ঘটনার পর হাসপাতালের ভিতরে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে লিফট ব্যবহারে ভয় দেখা দিয়েছে। অনেকেই এখন সিঁড়ি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লিফট ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের মতো জায়গায় পরিকাঠামোর নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে লিফটের মতো ব্যবস্থাগুলি প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ব্যবহার করেন, তাই সেগুলির নিরাপত্তা নিয়ে কোনওরকম ঢিলেমি মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই ঘটনা প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তা বিধি কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এমন ঘটনা প্রমাণ করে যে কোথাও না কোথাও ব্যবস্থার বড়সড় ঘাটতি রয়েছে।
মৃত ব্যক্তির পরিবার এখন গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে। তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সাহায্য এবং পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এই লিফট দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিরাপত্তা ঘাটতির একটি বড় উদাহরণ। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।