গরমের দাপটের মাঝেই আচমকা স্বস্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে কালবৈশাখী। রবিবার থেকে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হওয়ায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে আবহাওয়া দফতর সতর্ক করে জানিয়েছে, এই স্বস্তির আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে বজ্রঝড়, বিদ্যুৎ চমক এবং দমকা হাওয়ার আশঙ্কা। আগামী কয়েকদিন এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
শনিবার রাত থেকেই শহর কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা লক্ষ্য করা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দমকা হাওয়া ও বৃষ্টিপাত। কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল ঝড়ের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। এমনকি দক্ষিণবঙ্গের কিছু জেলায় শিলাবৃষ্টির খবরও মিলেছে। এই আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে রাতারাতি কয়েক ডিগ্রি কমে যায় তাপমাত্রা, যা দীর্ঘদিনের গরমে অতিষ্ঠ মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে।
আবহাওয়া দফতরের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প প্রবেশ করছে স্থলভাগে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি সক্রিয় ট্রফ লাইন, যা গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে বিস্তৃত। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে তৈরি হয়েছে অনুকূল পরিস্থিতি, যার জেরেই কালবৈশাখীর মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মার্চ মাসের শেষভাগে এই ধরনের ঝড়-বৃষ্টি অস্বাভাবিক নয়, তবে এবারের তীব্রতা কিছুটা বেশি বলেই মনে করা হচ্ছে।
কলকাতায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কয়েকদিন আগেও যেখানে স্বাভাবিকের উপরে ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বৃষ্টির জেরে তা এক ধাক্কায় বেশ কয়েক ডিগ্রি নেমে এসেছে। ফলে শহরবাসী আপাতত তীব্র গরম থেকে খানিকটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে এই স্বস্তি যে দীর্ঘস্থায়ী হবে না, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। কারণ ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলে আবার তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়া। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এর ফলে গাছ উপড়ে পড়া, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে যাওয়া বা যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যেই কিছু এলাকায় জল জমে যাওয়ার খবর মিলেছে, যার ফলে শহরের রাস্তায় যানজটও দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর সহ বিভিন্ন জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভারী বৃষ্টিও হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকায় সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কালবৈশাখী সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হলেও এর প্রভাব বেশ তীব্র হয়। হঠাৎ করে প্রবল দমকা হাওয়া, বজ্রপাত এবং অল্প সময়ের মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাত—এই তিনের সংমিশ্রণই কালবৈশাখীর মূল বৈশিষ্ট্য। ফলে এই সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। খোলা জায়গায় না থাকা, বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং বিদ্যুতের খুঁটির কাছাকাছি না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, গ্রামাঞ্চলে চাষের জমিতে কাজ করা কৃষকদেরও সতর্ক করা হয়েছে। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। একইসঙ্গে মৎস্যজীবীদেরও সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ ঝড়ের প্রভাবে জলরাশিও উত্তাল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, শহরের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সকালবেলায় অনেক জায়গায় রাস্তায় জল জমে যাওয়ায় যান চলাচলে ধীরগতি দেখা যায়। অফিসযাত্রীদের ভোগান্তিও বেড়েছে। তবে গরম থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়ায় অনেকেই এই বৃষ্টিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। অর্থাৎ মাঝেমধ্যেই ঝড়-বৃষ্টি চলবে এবং আকাশ মেঘলা থাকবে। যদিও প্রতিদিন একই রকম তীব্রতা নাও থাকতে পারে, তবুও বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কালবৈশাখী একদিকে যেমন গরম থেকে স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই নিয়ে আসছে নতুন উদ্বেগ। তাই আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের মধ্যে সচেতন থাকাই সবচেয়ে বড় উপায়। আবহাওয়া দফতরের নির্দেশ মেনে চলা এবং ঝড়-বৃষ্টির সময় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা—এই দুটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।
পরিস্থিতির উপর নজর রেখে প্রশাসনও প্রস্তুত রয়েছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ ও বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরকে সতর্ক রাখা হয়েছে, যাতে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
শেষ কথা, স্বস্তির হাওয়া বইলেও ঝড়ের ঝুঁকি রয়েই যাচ্ছে—তাই সাবধান থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।