ফের কালবৈশাখীর জোড়া আঘাতের আশঙ্কা, ২৭ থেকে ৩০ মার্চ দক্ষিণবঙ্গে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা

রাজ্যে গরমের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তেই ফের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কালবৈশাখীর দাপট নিয়ে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৭ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং দমকা হাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই আবহাওয়ার যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার কালবৈশাখীর দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হতে চলেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে সাধারণত বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার তারতম্য বাড়তে থাকে। এই সময়েই বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প উঠে এসে স্থলভাগের গরম হাওয়ার সঙ্গে মিশে যায়, যার ফলে সৃষ্টি হয় অস্থির আবহাওয়া পরিস্থিতি। এই অস্থিরতাই কালবৈশাখীর মতো প্রবল বজ্রঝড়ের জন্ম দেয়।

বর্তমানে West Bengal-এর বিভিন্ন জেলায় দিনের তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে Kolkata সহ দক্ষিণবঙ্গের শহরাঞ্চলে দিনের বেলায় তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে দিনের বেলায় অস্বস্তিকর গরম এবং আর্দ্রতা বাড়ছে।

তবে এই গরমই আবার ঝড়ের পূর্বাভাস বহন করছে। আবহাওয়া দফতরের মতে, ২৬ মার্চ পর্যন্ত আবহাওয়া মূলত শুষ্ক থাকবে, তবে তার পর থেকেই ধীরে ধীরে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করবে। ২৭ মার্চ থেকে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২৮ ও ২৯ মার্চ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এই সময় ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে পারে এবং দমকা হাওয়ার গতি ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ৩০ মার্চ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।

এই ঝড়-বৃষ্টির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বীরভূম, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মালদহ জেলায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই জেলাগুলিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বেশি থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিকে “স্কোয়াল লাইন” বলা হয়, যেখানে একাধিক বজ্রঝড় একসঙ্গে তৈরি হয়ে দীর্ঘ লাইনের মতো বিস্তৃত হয়। এই ধরনের ঝড় সাধারণ ঝড়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয় এবং এর প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, এই সময় বজ্রপাত অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা জলাশয়ের কাছাকাছি অবস্থান করলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এই আবহাওয়ার প্রভাব কৃষিক্ষেত্রেও পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই বৃষ্টি ফসলের জন্য উপকারী হলেও, অতিরিক্ত ঝড় বা শিলাবৃষ্টি হলে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং আম, লিচুর মতো ফলের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

শহরাঞ্চলে জল জমার সমস্যাও নতুন করে দেখা দিতে পারে। কলকাতা এবং আশপাশের এলাকায় যদি স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টি হয়, তাহলে রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়তে পারে এবং যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। অফিসযাত্রীদের জন্য এই পরিস্থিতি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় হালকা ঝড়-বৃষ্টির প্রভাব দেখা গিয়েছে, যা বড় ঝড়ের পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হচ্ছে। আবহাওয়া দফতর মনে করছে, এই প্রবণতাই আগামী কয়েকদিনে আরও জোরদার হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিষেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা দল এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে, মার্চের শেষ সপ্তাহে ফের একবার প্রকৃতির রূপ বদলাতে চলেছে। একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। তাই আগাম সতর্কতা এবং সচেতনতা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

এখন নজর থাকবে, পূর্বাভাস অনুযায়ী ঝড় কতটা তীব্র হয় এবং রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রভাব কতটা পড়ে। তবে আপাতত পরিষ্কার, গরমের মধ্যেই আবার আসছে কালবৈশাখীর ঝড়—যা স্বস্তি যেমন আনতে পারে, তেমনই নতুন করে বিপদের কারণও হতে পারে।

About the Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these