পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর প্রাক্কালে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ চরমে উঠছে। সেই উত্তেজনারই এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি দেখা গেল সোমবার হাওড়ায়, যেখানে মনোনয়ন জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে একপ্রকার রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় জেলাশাসকের দফতর চত্বর। ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে যেমন চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
সোমবার সকাল থেকেই হাওড়া সদর এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলির কর্মী-সমর্থকদের ভিড় বাড়তে থাকে। বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিতে আসেন। সেই সময় থেকেই শুরু হয় স্লোগান যুদ্ধ। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থকেরা “জয় বাংলা” স্লোগান তুলছিলেন, অন্যদিকে বাম কর্মীরা পাল্টা “চোর চোর” স্লোগান দিতে থাকেন। ক্রমশ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রথমে স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ধাক্কাধাক্কি এবং উত্তেজনায় রূপ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, দুই পক্ষের মধ্যে শারীরিক সংঘর্ষের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের কর্মীদের উপর হামলা চালানো হয়েছে এবং মহিলা সমর্থকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও বামপন্থী দলগুলির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং পাল্টা দাবি করা হয়েছে যে, তারাই প্রথমে উসকানির শিকার হয়েছেন।
ডোমজুড়ের এক তৃণমূল সমর্থক জানান, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এসেছিলাম। হঠাৎই বাম কর্মীরা আমাদের উদ্দেশে কটূক্তি করতে শুরু করে। প্রতিবাদ করতেই আমাদের ধাক্কা দেওয়া হয়।” একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে আরও কয়েকজনের মুখে।
অন্যদিকে, বামপন্থী এক কর্মীর বক্তব্য, “আমরা আমাদের প্রার্থীদের সমর্থনে এসেছিলাম। হঠাৎ তৃণমূলের পক্ষ থেকে আমাদের দিকে স্লোগান দিয়ে উসকানি দেওয়া হয়। তারপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।”
এই উত্তেজনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, মনোনয়ন প্রক্রিয়া যাতে বাধাহীনভাবে সম্পন্ন হয়, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। জেলাশাসকের দফতরের ভেতরে নির্দিষ্ট সংখ্যক লোককে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় এবং বাইরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
হাওড়া সিটি পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, “পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণের উত্তেজনার পর সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসে এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন হয়।”
তবে শুধু হাওড়াতেই নয়, একই দিনে আলিপুরেও মনোনয়ন ঘিরে উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে বিজেপি প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশের সঙ্গে বিজেপি কর্মীদের বচসাও হয়। তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে স্লোগান যুদ্ধেও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মনোনয়ন পর্ব থেকেই যদি এই ধরনের সংঘর্ষ দেখা যায়, তাহলে ভোটের দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে সাধারণ মানুষের একাংশ এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের বক্তব্য, নির্বাচন মানেই গণতান্ত্রিক উৎসব, কিন্তু সেই উৎসব যদি সংঘর্ষে পরিণত হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে রাজ্যের সামগ্রিক পরিবেশের উপর।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা চাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। কিন্তু যেভাবে উত্তেজনা বাড়ছে, তাতে ভয় লাগছে। প্রশাসনের আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, আগামী দিনগুলিতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হবে বলেও জানা গেছে।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে। একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে সব পক্ষই। তবে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই উত্তেজনা কি শুধুই নির্বাচনী আবহের অংশ, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও গভীর রাজনৈতিক কৌশল?
সব মিলিয়ে, হাওড়ার এই ঘটনা রাজ্যের নির্বাচনী পরিবেশকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আগামী দিনে এই উত্তেজনা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।