গরমে নাজেহাল পরিস্থিতির মাঝেই আচমকা বদলে গেল রাজ্যের আবহাওয়া। সকাল থেকেই আকাশে মেঘের আনাগোনা, সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলছিলই। আর সেই আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কালবৈশাখীর ঝড়-বৃষ্টি ধেয়ে আসছে, যা আগামী তিন দিন ধরে দফায় দফায় প্রভাব ফেলতে পারে।
দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ—প্রায় গোটা রাজ্যই এই আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাবে আক্রান্ত হতে চলেছে। কোথাও ঝোড়ো হাওয়া, কোথাও বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি, আবার কোথাও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
কী কারণে এই হঠাৎ পরিবর্তন?
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিস্থিতির পিছনে রয়েছে একাধিক আবহাওয়াগত কারণের যুগলবন্দি। ওড়িশা সংলগ্ন এলাকায় একটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে উত্তর ভারতের উপর দিয়ে একটি নিম্নচাপ অক্ষরেখা বিস্তৃত রয়েছে।
এই দুই সিস্টেমের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প রাজ্যের দিকে প্রবেশ করছে। ফলে আকাশে দ্রুত বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হচ্ছে। এই ধরনের মেঘ থেকেই সাধারণত কালবৈশাখীর ঝড়ের উৎপত্তি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন বজায় থাকলে ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ বাড়তে পারে।
দক্ষিণবঙ্গে কোথায় কতটা প্রভাব?
আজ বুধবার দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু জেলায় ঝড়-বৃষ্টির তীব্রতা বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাস। বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, হাওড়া এবং হুগলি জেলাগুলিতে দুর্যোগের আশঙ্কা প্রবল।
এই জেলাগুলিতে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। সঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ এবং শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কলকাতা-সহ আশপাশের এলাকাগুলিতে ঝড়ের গতিবেগ কিছুটা কম হলেও ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গেও বাড়ছে ঝুঁকি
উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও একই চিত্র দেখা যেতে পারে। মালদা ও দক্ষিণ দিনাজপুরে ঝড়-বৃষ্টির তীব্রতা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলাগুলিতে বজ্রপাত এবং শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই অঞ্চলেও ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে, আর কিছু ক্ষেত্রে তা ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
কতদিন চলবে এই দুর্যোগ?
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে।
এই সময়ের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ঝড়-বৃষ্টি চলবে, যদিও ধীরে ধীরে তার তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে।
শুক্রবারের পর উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় বৃষ্টি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে এবং দক্ষিণবঙ্গে আবহাওয়া ক্রমশ শুষ্ক হতে শুরু করবে।
উইকেন্ডে কী অপেক্ষা করছে?
শনিবার এবং রবিবার থেকে রাজ্যে শুষ্ক আবহাওয়া ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এর সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রাও আবার বাড়তে পারে। ফলে গরমের অস্বস্তি ফের বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিবর্তন আবহাওয়ার অস্থিরতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাব
বর্তমানে ঝড়-বৃষ্টির কারণে দিনের এবং রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম রয়েছে।
কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ২১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে, আর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রির আশেপাশে রয়েছে।
বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৫৮ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
এর ফলে গুমোট ভাবও বজায় থাকবে, যা মানুষের অস্বস্তি আরও বাড়াতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা
আবহাওয়াবিদরা সাধারণ মানুষকে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
ঝড়ের সময় দুর্বল ঘরবাড়ি বা পুরনো কাঠামোর কাছে না যাওয়াই ভালো।
এছাড়াও, মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ সমুদ্রের পরিস্থিতিও অশান্ত থাকতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব
এই ঝড়-বৃষ্টি কৃষিক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
যেসব এলাকায় শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে এই বৃষ্টি গরমের তীব্রতা কমিয়ে কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
শহুরে জীবনে প্রভাব
শহরাঞ্চলেও এই আবহাওয়ার প্রভাব পড়তে পারে।
ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, গাছ পড়ে যাওয়া বা যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
অফিসযাত্রীদের জন্যও সমস্যা তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে বিকেলের দিকে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে রাজ্যের আবহাওয়া আপাতত অস্থির এবং অনিশ্চিত।
কালবৈশাখীর এই দফায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও ঝড়-বৃষ্টির ঝুঁকি এড়ানো যাচ্ছে না। আগামী তিন দিন বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এই সময়ের মধ্যে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
SENews Bangla পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং আবহাওয়ার প্রতিটি আপডেট আপনাদের কাছে পৌঁছে দেবে।