বিশ্ব সামরিক শক্তির মঞ্চে আজ যখন আমেরিকা তাদের অত্যাধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান F-35 নিয়ে গর্ব করে, তখন ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে উঠে আসে এক বিস্ময়কর অধ্যায়। প্রায় ছয় দশক আগে, ঠান্ডা যুদ্ধের উত্তাল সময়ে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন এক পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করেছিল, যা আজও গতির নিরিখে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
এই সাবমেরিনটির নাম ছিল K-222। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল বিশ্বের দ্রুততম সাবমেরিন। পরীক্ষামূলক অভিযানে এই সাবমেরিন পানির নিচে ঘণ্টায় প্রায় ৮২ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম হয়েছিল—যা আজও কোনও সক্রিয় সাবমেরিনের পক্ষে ছোঁয়া সম্ভব হয়নি। সেই কারণেই একে বলা হতো ‘সমুদ্রের সুলতান’।
সোভিয়েত নৌবাহিনীর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলিকে টেক্কা দেওয়া। দ্রুতগতির মাধ্যমে শত্রুপক্ষের রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে আঘাত হানাই ছিল K-222–এর প্রধান কৌশল। সেই সময়ে এই সাবমেরিন বিশ্ব সামরিক প্রযুক্তিতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
তবে এই অসাধারণ সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল বড় বিপদ। অত্যন্ত বেশি গতির জন্য সাবমেরিনটি মারাত্মক শব্দ তৈরি করত, যা গোপন অভিযানের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্তু, জটিল প্রযুক্তি, অতিরিক্ত খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা K-222–কে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার অনুপযোগী করে তোলে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে একটি মারাত্মক প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে। নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই সোভিয়েত নৌবাহিনী ধীরে ধীরে এই প্রকল্প থেকে সরে আসে। শেষ পর্যন্ত, রেকর্ড গড়া সাবমেরিনটি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে তার পূর্ণ সম্ভাবনার ব্যবহার আর সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, K-222 প্রমাণ করে দিয়েছিল যে শুধুমাত্র গতি নয়, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শব্দহীনতা, গোপনীয়তা এবং নির্ভরযোগ্যতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বের নৌবাহিনীগুলি তাই আজ গতির বদলে প্রযুক্তিগত নীরবতা ও নজর এড়িয়ে চলার কৌশলকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবুও, প্রায় ৬০ বছর আগে তৈরি হওয়া এই সোভিয়েত সাবমেরিন আজও সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য বিস্ময়। আধুনিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগে দাঁড়িয়েও K-222 স্মরণ করিয়ে দেয়—একটি যুগে সাহসী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দুঃসাহস কীভাবে বিশ্বকে চমকে দিতে পারে।