পূর্ব কলকাতার আনন্দপুর এলাকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গোটা শহর জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একটি ডেকোরেটর সংস্থার অফিস ও গোডাউনে আচমকা আগুন লেগে একাধিক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, আগুন লাগার সময় ভিতরে থাকা শ্রমিকদের কাছে বেরোনোর কোনও বিকল্প পথ ছিল না, যার জেরেই এই ভয়াবহ প্রাণহানি।
ঘটনাটি ঘটে ইএম বাইপাস সংলগ্ন আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে গোডাউনের ভিতর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখে প্রথমে স্থানীয়রা বিষয়টি লক্ষ্য করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং গোটা গোডাউনটি আগুনের গ্রাসে চলে যায়।
আগুন ছড়ানোর কারণ কী?
গোডাউনে বিপুল পরিমাণে দাহ্য সামগ্রী, প্লাস্টিক, কাপড়, কাঠের সাজসজ্জার জিনিস ও রাসায়নিক উপাদান মজুত ছিল। সেই কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আওয়াজও শোনা যায়, যা আগুনকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
পালানোর পথ ছিল না!
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে উদ্ধারকাজের সময়। ফায়ার ব্রিগেড ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোডাউনের ভিতরে যথাযথ জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না। অধিকাংশ শ্রমিক ভিতরে কাজ করছিলেন এবং আগুন লাগার পর ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ঢেকে যায়। ফলে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং বেরিয়ে আসার সুযোগ পাননি।
দীর্ঘ উদ্ধারকাজ
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকলের একাধিক ইঞ্জিন। তবে সংকীর্ণ রাস্তা ও প্রবল আগুনের কারণে উদ্ধারকাজে যথেষ্ট সমস্যা হয়। প্রায় ১৯ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলে। আগুন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে ঝলসানো দেহাংশ উদ্ধার করা হয়, যা মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিখোঁজের অভিযোগ, বাড়ছে উৎকণ্ঠা
এই ঘটনায় এখনও একাধিক শ্রমিক নিখোঁজ বলে অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের। অনেকে রাতভর গোডাউনের ভিতরেই ছিলেন বলে অনুমান। নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের দাবি, দ্রুত DNA পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করে তাঁদের হস্তান্তর করা হোক।
প্রশাসনের ভূমিকা ও তদন্ত
ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। আগুন লাগার সঠিক কারণ জানতে ফরেনসিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গোডাউনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স ও বিল্ডিং প্ল্যান খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে গাফিলতির ইঙ্গিত মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আবারও শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক গোডাউন ও কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমন পথ না থাকলে এমন দুর্ঘটনা যে কোনও সময় ঘটতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
শোকস্তব্ধ এলাকা
আনন্দপুর এলাকাজুড়ে এখন শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত এবং মৃত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্রুত দোষীদের শাস্তির দাবিও উঠছে।