নয়াদিল্লি/কলকাতা: ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এবং বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) ভাতা ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের পর এবার কমিশন প্রকাশ্যে এসে BLO-দের ভাতা সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিল।
নির্বাচন কমিশন জানায়, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়ায় যুক্ত BLO-দের জন্য নির্ধারিত ভাতা এখনো পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। কমিশনের দাবি, কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী একজন BLO-কে মোট ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা পাওয়ার কথা, অথচ পশ্চিমবঙ্গে এখনো তার সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
ভাতা নিয়ে কী বলছে নির্বাচন কমিশন
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকার এখনও পর্যন্ত BLO-দের আংশিক ভাতা দিয়েছে। কমিশনের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের প্রাপ্য অর্থ দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে যুক্ত কর্মীদের আর্থিক সুবিধা নিয়ে কোনও রকম গড়িমসি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।
কমিশন আরও জানায়, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় BLO-রা মাঠে নেমে কাজ করছেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা বা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হলে তা গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মমতার অভিযোগ ও তার পরিপ্রেক্ষিত
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং রাজ্য প্রশাসনের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের পর নির্বাচন কমিশন জানায়, তারা সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে না। কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে এবং এর লক্ষ্য হল ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখা।
BLO-দের কাজ নিয়ে কমিশনের সতর্কতা
নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, SIR প্রক্রিয়ায় যুক্ত কোনও BLO বা নির্বাচন সংক্রান্ত আধিকারিককে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া বা কাজে বাধা দেওয়া হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিশনের মতে, নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সুরক্ষা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়াও কমিশন দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জনপ্রতিনিধির বক্তব্য ও আচরণ নির্বাচন ব্যবস্থার মর্যাদার পরিপন্থী। কমিশনের বক্তব্য, এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য শুভ নয়।
রাজ্য–কেন্দ্র সংঘাতের আরেক অধ্যায়?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, BLO ভাতা ও ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক আসলে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সাংবিধানিক সংস্থার মধ্যে চলা দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের আরেকটি অধ্যায়। বিশেষ করে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিষয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। কারণ ভোটার তালিকার নির্ভুলতা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা সরাসরি গণতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত।
সব মিলিয়ে, BLO ভাতা ইস্যু এখন আর শুধু প্রশাসনিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে এবং আগামী দিনে এই বিষয় নিয়ে রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।