বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান গতিপথ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন ডলারের শক্ত অবস্থানের মধ্যেও সোনার গুরুত্ব ফের একবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পিটার শিফ সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন, তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারী ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে—ডলারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড়সড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে এবং সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে সোনা।
পিটার শিফের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে। একসময় যে ডলার ছিল বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা, সেই অবস্থান দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ণ থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাঁর দাবি, বিশ্বের একাধিক দেশ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আগের মতো মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের উপর নির্ভর না করে সোনার মজুত বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, ক্রমবর্ধমান ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের ওঠানামা—এই সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। ইতিহাস বলছে, অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সোনাই বারবার ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
পিটার শিফ আরও সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৮ সালের বিশ্ব আর্থিক সংকটের থেকেও বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, তখনকার সংকট ছিল মূলত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকেন্দ্রিক, কিন্তু এখনকার সমস্যা গোটা মুদ্রা ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। ডলার-নির্ভর বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যদি ফাটল ধরে, তার প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি-রপ্তানি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনীতিতেও।
এই বক্তব্য ঘিরে অবশ্য মতভেদও রয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ এখনও মনে করেন, ডলার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা এবং নিকট ভবিষ্যতে তার বিকল্প তৈরি হওয়া সহজ নয়। তবে সোনার চাহিদা যে বাড়ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির রিজার্ভ নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে, তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দামে বড় ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। কখনও দাম ছুঁয়েছে রেকর্ড উচ্চতা, আবার কখনও হয়েছে সামান্য সংশোধন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার পিছনে ডলারের শক্তি, সুদের হার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাব—সবকিছুই ভূমিকা নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে পিটার শিফের বক্তব্য বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ডলার বনাম সোনার এই টানাপোড়েন শুধু বিনিয়োগের প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে এই সতর্কবার্তা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক মহল।