কলকাতা: ‘বন্দে মাতরম’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বাঁধল রাজ্যে। এবার সরাসরি আরএসএস-কে নিশানা করলেন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। তাঁর মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক চাপানউতোর। রাজ্য বনাম কেন্দ্রের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক টানাপোড়েন যেন আরও একবার প্রকাশ্যে এল এই ঘটনাকে ঘিরে।
সম্প্রতি ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় স্তরে একাধিক কর্মসূচির কথা ঘোষণা করা হয়। সরকারি অনুষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নির্দেশিকা জারি হয়েছে বলেও জানা যায়। এই প্রেক্ষাপটেই ব্রাত্য বসু প্রশ্ন তোলেন, কেন এই বিষয়টিকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আবহ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, জাতীয় গানকে সম্মান জানানো নিয়ে কারও আপত্তি নেই, কিন্তু তা যেন কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।
শিক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করেন, আরএসএস ঐতিহাসিকভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবধারা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে সেভাবে মান্যতা দেয়নি। তাঁর কথায়, “বাংলার সংস্কৃতি বহু ধারার মিলনে গড়ে উঠেছে। সেখানে কোনও এক ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে অন্যকে খাটো করার চেষ্টা অনভিপ্রেত।” তিনি আরও বলেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম’ যেমন স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা, তেমনই রবীন্দ্রনাথের ভাবনাও ভারতের আত্মার অংশ। দুই মনীষীর অবদানকে পরস্পরের বিরোধে দাঁড় করানো ঠিক নয়।
এই মন্তব্যের জেরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ ব্রাত্য বসুর বক্তব্যকে সমর্থন করে জানিয়েছে, জাতীয় প্রতীক বা গান নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়। অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় আবেগের বিষয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে দেশের ঐতিহ্যকে ছোট করা। তাঁদের মতে, ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় গানকে মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগকে অযথা বিতর্কিত করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক নয়, এর গভীরে রয়েছে আদর্শিক দ্বন্দ্ব। বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্র—উভয়েই গর্বের প্রতীক। ফলে তাঁদের নাম জড়িয়ে কোনও বিতর্ক তৈরি হলে তা দ্রুত আবেগের ইস্যু হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নির্বাচনের আবহে এমন বিষয় রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বন্দে মাতরম’ স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আবার ‘জন গণ মন’ জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের রচনায়। দুই সৃষ্টিই ভারতের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই ইস্যুতে রাজনৈতিক বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল ও আলোচনা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আদর্শগত সংঘাত নতুন নয়। তবে জাতীয় প্রতীক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। আগামী দিনে এই ইস্যু কতটা রাজনৈতিক রূপ নেয়, সেটাই এখন দেখার।
সব মিলিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কে ব্রাত্য বসুর মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জাতীয় গান, ইতিহাস ও মতাদর্শ—এই তিনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়, যার প্রতিধ্বনি আগামী দিনেও শোনা যেতে পারে।