আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ল বিশ্ব অর্থনীতিতে। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। একধাক্কায় প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত লাফ দিয়েছে ক্রুড অয়েলের মূল্য। তারই জেরে তীব্র ধাক্কা খেল ভারতীয় শেয়ার বাজার। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই প্রায় ১০০০ পয়েন্ট পর্যন্ত পড়ে গেল BSE Sensex, পাশাপাশি বড় পতন দেখা গেল Nifty 50-এও।
তেলের বাজারে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক বাজারে Brent Crude-এর দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের গণ্ডি ছুঁয়েছে। একইভাবে WTI Crude-এর দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাই এই উল্লম্ফনের মূল কারণ।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবহণ হয়। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আগাম মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
শেয়ার বাজারে বড় ধস
তেলের দাম বাড়ার খবর প্রকাশ্যে আসতেই দালাল স্ট্রিটে শুরু হয় ব্যাপক বিক্রি। সকালে বাজার খোলার পর থেকেই চাপের মুখে পড়ে সূচকগুলি। একসময় BSE Sensex প্রায় ১০০০ পয়েন্ট পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। অন্যদিকে Nifty 50 ২৪,৯০০-এর নীচে নেমে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়।
ব্যাংকিং, অটো, আইটি ও এভিয়েশন সেক্টরে বড় পতন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে এভিয়েশন ও তেলনির্ভর সংস্থাগুলির শেয়ারে বেশি চাপ পড়েছে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে তাদের পরিচালন ব্যয় সরাসরি বেড়ে যায়।
নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝোঁক
বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার আবহে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সোনার পাশাপাশি মার্কিন ডলারও শক্তিশালী হতে পারে।
ভারতের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
ভারত একটি তেল আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, চলতি হিসাবের ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতির উপর। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উপরও।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে আগামী কয়েক মাসে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদের হার নীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সামনে কী?
বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা চলছে। তবে পরিস্থিতি এখনও অস্থির। তেলের বাজার ও শেয়ার বাজার উভয়ই সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আঁচ এখন সরাসরি পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। তেলের দামে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন এবং শেয়ার বাজারে ধস — দুই মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আগামী দিনে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ।