মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আশঙ্কা, ভারতে রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিয়ে সতর্কতা—রিফাইনারিগুলিকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রভাব এবার পড়তে পারে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিশেষ করে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি (LPG) সরবরাহ নিয়ে সম্ভাব্য সংকট এড়াতে আগেভাগেই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে কেন্দ্র সরকার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার দেশের তেল শোধনাগারগুলিকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যাতে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যায় না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সরকারি সূত্রে খবর, দেশের বিভিন্ন তেল শোধনাগারকে বলা হয়েছে তারা যেন প্রোপেন ও বিউটেনের মতো উপাদানগুলিকে বেশি করে এলপিজি উৎপাদনে ব্যবহার করে। সাধারণত এই উপাদানগুলির একটি বড় অংশ পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের রান্নার গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের উপর। কারণ দেশটি তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের বড় অংশই ওই অঞ্চল থেকে আমদানি করে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির উপর ভারতের নির্ভরতা দীর্ঘদিনের। ফলে ওই অঞ্চলে কোনও সামরিক সংঘাত বা পরিবহণ সমস্যার সৃষ্টি হলে তার প্রভাব ভারতীয় বাজারেও পড়তে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ—হরমুজ প্রণালী—দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহণ করা হয়। এই পথ যদি কোনও কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে শুধু জ্বালানি খাত নয়, অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।

এই কারণেই ভারত সরকার পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে আগাম প্রস্তুতি নিতে চাইছে। দেশের বড় বড় তেল সংস্থা যেমন ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামকে গৃহস্থালির জন্য এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে। যাতে দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের রান্নার গ্যাস পরিষেবা ব্যাহত না হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বিশাল দেশে এলপিজি সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম—প্রায় সর্বত্রই রান্নার কাজে এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার মতো বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বহু গ্রামীণ পরিবারও এখন এলপিজি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিফাইনারিগুলিকে প্রযুক্তিগত দিক থেকেও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি মজুতের পরিমাণ নিয়েও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও এই যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কিছু ক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক সমস্যার খবরও সামনে এসেছে। এর ফলে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়া গ্যাসের ক্ষেত্রে কিছু সংস্থাকে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে তাহলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। এতে আমদানি নির্ভর দেশগুলির উপর চাপ বাড়বে। ভারতের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে মুদ্রাস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয়ের উপর।

তবে সরকারি মহলের দাবি, আপাতত দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক রয়েছে। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই জানানো হয়েছে। সরকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনও দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ভারত আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব যাতে ভারতের গৃহস্থালির রান্নাঘরে না পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যেই এখন থেকেই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে কেন্দ্র সরকার। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার উপরই আগামী দিনে জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

About the Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these