কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে ঘিরে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে রাজ্যজুড়ে। লিফট বিকল হয়ে পড়ার ঘটনায় এক ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। এবার সেই ঘটনার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সামনে আসতেই আরও গভীর হয়েছে রহস্য, উঠছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন—এটি কি শুধুই দুর্ঘটনা, না কি এর পিছনে রয়েছে চরম গাফিলতি?
মৃত ব্যক্তির নাম অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি তাঁর অসুস্থ সন্তানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। সেই সময় ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের একটি লিফটে ওঠেন তিনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে। অভিযোগ, লিফটটি মাঝপথে আচমকাই বিকল হয়ে পড়ে এবং ভেতরে থাকা যাত্রীরা আটকে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে সামান্য যান্ত্রিক সমস্যার মতো মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। লিফটটি হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে নিচের দিকে নেমে যায় বলে অভিযোগ। ভেতরে থাকা যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় ধরে লিফট আটকে থাকায় ভেতরে শ্বাসকষ্ট ও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
তবে ঘটনার মোড় ঘোরে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে একাধিক গুরুতর আঘাতের ফলে। তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষতচিহ্ন, পাঁজরের হাড় ভাঙা, বুকে প্রবল আঘাত এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আঘাত সাধারণ লিফটে আটকে পড়ার কারণে হওয়া কঠিন, ফলে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, লিফটটি হঠাৎ করে নিচের দিকে পড়ে যাওয়া বা মারাত্মক ঝাঁকুনির ফলে এই ধরনের আঘাত লাগতে পারে। যদি লিফটের সেফটি সিস্টেম সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই তত্ত্ব সামনে আসতেই হাসপাতালের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
হাসপাতালের ভেতরে কর্মরত কিছু চিকিৎসক ও কর্মচারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকভাবে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বিল্ডিংয়ের লিফট নিয়ে আগেও একাধিকবার অভিযোগ উঠেছিল। নিয়মিত সার্ভিসিং ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি মেরামতির ক্ষেত্রে ঘাটতির অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। যদিও প্রশাসনের তরফে এই বিষয়ে স্পষ্ট কোনও বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনার পর মৃতের পরিবার ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, লিফটের মধ্যে আটকে থাকার পর দীর্ঘ সময় ধরে কোনও কার্যকর উদ্ধার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বারবার সাহায্যের আবেদন জানানো হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। পরিবারের এক সদস্যের কথায়, “যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হত, হয়তো আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হত না।”
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একটি বড় সরকারি হাসপাতালে এমন দুর্ঘটনা এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব কেন হল, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ইতিমধ্যেই পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। লিফটের প্রযুক্তিগত অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণের নথি, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার ভূমিকা—সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, লিফটটির শেষ কবে সার্ভিসিং হয়েছিল এবং কোনও ত্রুটি আগেই চিহ্নিত হয়েছিল কি না।
এই ঘটনার জেরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এটি শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। অন্যদিকে শাসকদলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় অবকাঠামোগত নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ও তাঁদের পরিবার এই ধরনের পরিষেবার উপর নির্ভর করেন। সেখানে একটি লিফটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার ত্রুটি শুধু অসুবিধাই নয়, প্রাণঘাতী বিপদও ডেকে আনতে পারে।
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকাঠামোগত নিরাপত্তা কতটা সুনিশ্চিত? আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও যদি রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি থাকে, তাহলে এই ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নগরবাসীর একাংশের মতে, এই ধরনের ঘটনা শুধু দুঃখজনক নয়, উদ্বেগজনকও। সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মত তাঁদের। নিয়মিত পরিদর্শন, প্রযুক্তিগত আপডেট এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার দাবি উঠছে।
সব মিলিয়ে, আরজি কর হাসপাতালের এই লিফট দুর্ঘটনা একাধিক স্তরে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—প্রযুক্তিগত ত্রুটি, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার ধীরগতি—সব কিছুই এখন তদন্তের আওতায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট প্রকাশের পর এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এখন সকলের নজর তদন্তের দিকে। এই মৃত্যুর জন্য প্রকৃত দায় কার, তা নির্ধারণ করাই প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।