শৌচাগারে যেতে সিঁড়ি ভাঙতেই মৃত্যুর কোলে: আরজি কর হাসপাতালে ৬০ বছরের বৃদ্ধের মর্মান্তিক পরিণতি

কলকাতার অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র RG Kar Medical College and Hospital-এ আবারও সামনে এল চাঞ্চল্যকর এবং উদ্বেগজনক এক ঘটনা। অভিযোগ, শুধুমাত্র শৌচাগারে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি ভাঙতে গিয়েই মৃত্যু হল ৬০ বছরের এক রোগীর। মৃতের নাম বিশ্বজিৎ সামন্ত। এই ঘটনায় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বিশ্বজিৎবাবুকে। তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণে ছিলেন চিকিৎসকদের অধীনে। কিন্তু সেই অবস্থাতেই তাঁকে বাধ্য হতে হয় শৌচাগার ব্যবহারের জন্য সিঁড়ি ভেঙে অন্যত্র যেতে—যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনাটি ঘটে হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার ভবনে। অভিযোগ, ওই ভবনে রোগীদের জন্য সহজলভ্য শৌচাগারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে পুরুষ রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট শৌচাগার অন্য তলায় থাকায়, সেখানে পৌঁছাতে সিঁড়ি ব্যবহার করা ছাড়া উপায় ছিল না। লিফটের সুযোগ বা সহজ বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায়, বাধ্য হয়ে সিঁড়ি ভাঙতে হয় বিশ্বজিৎ সামন্তকে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করার সময়ই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সঙ্গে থাকা আত্মীয় ও অন্যান্য উপস্থিত ব্যক্তিরা দ্রুত সাহায্যের চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন রোগীর পরিবার ও অন্যান্য উপস্থিত মানুষজন। তাঁদের অভিযোগ, একটি বড় সরকারি হাসপাতালে যেখানে প্রতিদিন শত শত গুরুতর রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, সেখানে এমন মৌলিক পরিষেবার অভাব অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে ট্রমা কেয়ার ইউনিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে এই ধরনের অব্যবস্থা মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “মানুষ এখানে সুস্থ হতে আসে, কিন্তু শৌচাগারের মতো একটি সাধারণ প্রয়োজন মেটাতেই যদি জীবন দিতে হয়, তাহলে এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে?” এই মন্তব্যেই প্রতিফলিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হতাশা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও হাসপাতালের মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু চিকিৎসা পরিষেবাই নয়, পরিকাঠামোগত সুবিধাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য প্রতিটি তলায় সহজলভ্য শৌচাগার, লিফট এবং সহায়ক ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই মৌলিক বিষয়গুলির অভাব যে কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই ঘটনা একেবারেই বিচ্ছিন্ন নয় বলে অভিযোগ উঠছে। হাসপাতালটিতে এর আগেও একাধিকবার পরিকাঠামোগত ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক অতীতে লিফট বিকল হওয়া, পরিষেবার ঘাটতি এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বিশ্লেষকদের মতে, শহরের পুরনো সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে উন্নয়ন বা আধুনিকীকরণ হচ্ছে না। ফলে, দৈনন্দিন পরিষেবার ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যা কখনও কখনও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

এই ঘটনার পর রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কেন এত বড় একটি হাসপাতালে এখনও ন্যূনতম পরিকাঠামোর ঘাটতি রয়ে গেছে, তা নিয়ে জবাবদিহি দাবি করছেন অনেকেই। পাশাপাশি, দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে এই ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার দাবিও উঠেছে।

হাসপাতাল প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত বিস্তারিত কোনও সরকারি বিবৃতি সামনে আসেনি। তবে সূত্রের খবর, ঘটনাটি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। দায়িত্বে গাফিলতি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।

চিকিৎসক মহলের একাংশ মনে করছেন, শুধু দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নত করা জরুরি। বিশেষ করে রোগী-সহায়ক পরিষেবাগুলিকে আধুনিক ও সহজলভ্য করে তোলার ওপর জোর দেওয়া উচিত।

এই ঘটনায় মানবিক দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অসুস্থ, বয়স্ক মানুষ শুধুমাত্র একটি মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন—এই বাস্তবতা সমাজের কাছে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকে নয়, মানবিক এবং পরিকাঠামোগত দিক থেকেও সমানভাবে প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, বিশ্বজিৎ সামন্তের মৃত্যু শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুতর ত্রুটির প্রতিফলন। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের পাশাপাশি, ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও রোগীকে এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়, তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

এখন দেখার বিষয়, এই মর্মান্তিক ঘটনার পর প্রশাসন কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেয়, এবং আদৌ এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে কোনও বড় পরিবর্তন আনা হয় কিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these