নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকায় রান্নার গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডারের গুরুত্ব নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। শহর থেকে গ্রাম—প্রায় প্রতিটি পরিবারই আজ রান্নার জন্য নির্ভরশীল এলপিজির উপর। কিন্তু হঠাৎ করেই এই পরিষেবাকে ঘিরে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। নতুন নিয়মে আর আগের মতো যখন খুশি তখন গ্যাস বুক করা যাবে না—এই খবর সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে।
সরকারের তরফে চালু করা এই নতুন ব্যবস্থায় গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ, একবার সিলিন্ডার ডেলিভারি পাওয়ার পর নির্দিষ্ট দিন না কাটলে দ্বিতীয়বার বুকিং করা যাবে না। ফলে যাঁরা আগে থেকেই বাড়িতে অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত রাখার অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি বদলাতে চলেছে।
সূত্রের খবর, শহরাঞ্চলে এখন একটি সিলিন্ডার ডেলিভারির পর অন্তত ২৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে নতুন করে বুকিং করার জন্য। অন্যদিকে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় এই সময়সীমা আরও বেশি—প্রায় ৪৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এই নিয়ম কার্যকর হওয়ায় অনেকেই নতুন করে পরিকল্পনা করতে বাধ্য হবেন, বিশেষ করে যাঁদের বাড়িতে একটিমাত্র সিলিন্ডার রয়েছে।
এই পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সরকার মূলত দুটি দিক তুলে ধরছে। প্রথমত, কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সিলিন্ডার বুক করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। এতে প্রকৃত প্রয়োজনীয় গ্রাহকদের কাছে সময়মতো সিলিন্ডার পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছিল। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন জায়গায় কালোবাজারি এবং অতিরিক্ত মজুত করার অভিযোগও সামনে এসেছে। এই দুই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে এই যুক্তি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, বাস্তব পরিস্থিতিতে এই নিয়ম মেনে চলা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি, সেখানে গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ২৫ দিন বা ৪৫ দিন অপেক্ষা করা বেশ সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কলকাতা ও শহরতলির কিছু বাসিন্দার বক্তব্য, আগে তাঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী আগেভাগেই সিলিন্ডার বুক করে রাখতেন, যাতে হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে গেলে সমস্যায় পড়তে না হয়। কিন্তু এখন সেই সুবিধা আর থাকছে না। ফলে গ্যাস ব্যবহারে আরও সতর্ক হতে হবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
গ্রামীণ এলাকার ক্ষেত্রে সমস্যার মাত্রা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, সেখানে গ্যাস ডেলিভারির ব্যবধান অনেক সময়েই বেশি থাকে। তার উপর যদি ৪৫ দিনের বাধ্যতামূলক অপেক্ষা যোগ হয়, তাহলে অনেক পরিবার বিকল্প জ্বালানির দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারে।
যদিও প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, দেশে গ্যাসের কোনও ঘাটতি নেই। এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হল সুষ্ঠুভাবে সরবরাহ বজায় রাখা এবং যাতে প্রত্যেক গ্রাহক সময়মতো গ্যাস পান, তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, এটি কোনও সংকট মোকাবিলার পদক্ষেপ নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের নীতি পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এতে সাপ্লাই চেইন আরও সংগঠিত হবে এবং অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে। তবে স্বল্পমেয়াদে এর ফলে ভোক্তাদের কিছুটা অসুবিধার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এদিকে, গ্যাস এজেন্সিগুলিও নতুন নিয়ম কার্যকর করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বুকিং সিস্টেমে ইতিমধ্যেই কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বুকিংয়ের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে তাঁরা নির্দিষ্ট সময়সীমা পার না হলে নতুন বুকিং করতে পারবেন না।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এখন থেকেই গ্যাস ব্যবহারে পরিকল্পনা করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমানো, রান্নার সময় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা এবং সম্ভব হলে একটি অতিরিক্ত সিলিন্ডার সংযোগ রাখা—এই বিষয়গুলি মাথায় রাখা দরকার।
সব মিলিয়ে, এলপিজি সিলিন্ডার বুকিংয়ের এই নতুন নিয়ম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে একটি বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে। শুরুতে কিছুটা অসুবিধা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কতটা ইতিবাচক হয়, সেটাই এখন দেখার।
তবে আপাতত একটি বিষয় পরিষ্কার—গ্যাস বুকিং আর আগের মতো সহজ ও তাৎক্ষণিক নয়। নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা মেনে চলেই এখন থেকে পরিকল্পনা করতে হবে প্রতিটি পরিবারকে। আর এই পরিবর্তনই আগামী দিনে গ্যাস ব্যবহারের অভ্যাসে বড় রদবদল আনতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।