নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা/তমলুক:
দিঘার সমুদ্রতটে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার পর এখন সেই ঘটনাকে ঘিরে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা টলিউড মহল, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে একের পর এক প্রশ্ন। কীভাবে ঘটল এই দুর্ঘটনা? আদৌ কি শুধুই দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনও কারণ? সেই উত্তর খুঁজতেই এখন নজর তমলুক জেলা হাসপাতালে চলা ময়নাতদন্তের দিকে।
দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতাল থেকে অভিনেতার নিথর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে তমলুকে। হাসপাতাল সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এরপর সেই দেহ নিয়ে আসা হবে কলকাতার বিজয়গড়ে, যেখানে তাঁর স্থায়ী বাসভবন।
৬/৮৮ বিজয়গড়, কলকাতা-৩২—অনন্যা অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলায় অবস্থিত রাহুলের ফ্ল্যাট এখন যেন নিস্তব্ধ অপেক্ষায়। সেখানেই শেষবারের মতো ফিরবেন অভিনেতা। প্রতিবেশী এবং পরিচিত মহলেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সবাই অপেক্ষা করছেন শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।
এদিকে, রাহুলের ঘনিষ্ঠ মহল ইতিমধ্যেই তমলুক হাসপাতালে পৌঁছে গিয়েছে। জানা গিয়েছে, কলকাতা থেকে তাঁর ছয়জন স্কুলের বন্ধু এবং তাঁর মামা সেখানে উপস্থিত রয়েছেন। ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত সমস্ত সরকারি আনুষ্ঠানিকতায় তাঁর মামা সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও অভিনেতার ব্যক্তিগত গাড়ির চালক বাবলুও হাসপাতালে উপস্থিত আছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকেও সমস্ত প্রয়োজনীয় সম্মতি দেওয়া হয়েছে। রাহুলের স্ত্রী ভিডিও কলের মাধ্যমে ময়নাতদন্তের অনুমতি দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও আইনি প্রক্রিয়া যাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, তার জন্য পরিবার সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছে।
প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। দিঘার সমুদ্রতটে শুটিং চলাকালীনই এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা যাচ্ছে। তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে তিনি জলে নামেন এবং কীভাবে এই বিপর্যয় ঘটে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
দিঘার ডি.ওয়াই.এস.পি (ডি অ্যান্ড টি) মোহিত মোল্লা জানিয়েছেন, “দিঘা থেকে ওঁর নিথর দেহ তমলুক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য। মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। আমরা বিষয়টি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখছি।” এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
পুলিশ সূত্রে খবর, শুটিং চলাকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সমুদ্রের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুটিংয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, লাইফগার্ড বা নিরাপত্তাকর্মী উপস্থিত ছিলেন কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। কোনও ধরনের গাফিলতি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
স্থানীয়দের মতে, দিঘার ওই অংশে সমুদ্র অনেক সময়ই প্রতারণাময় হয়ে ওঠে। বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও হঠাৎ করেই স্রোতের গতি বেড়ে যেতে পারে। অভিজ্ঞ না হলে বা যথাযথ সতর্কতা না নিলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যায়। ফলে শুটিং ইউনিটের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনার জেরে শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা বিনোদন জগতের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মী, পরিচালক, প্রযোজক—সকলেই হতবাক এই আকস্মিক ঘটনায়। সামাজিক মাধ্যমেও শোকবার্তার ঢল নেমেছে। অনেকেই এই ঘটনাকে ‘অবিশ্বাস্য’ এবং ‘দুঃখজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে, অভিনেতার পরিবারের সদস্যরাও কলকাতা থেকে তমলুকের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর তাঁর দেহ নিয়ে আসা হবে বিজয়গড়ের বাসভবনে। সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর সম্পন্ন হবে শেষকৃত্য।
এই পুরো ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় ভরসা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্ত। সেটিই স্পষ্ট করে দেবে, এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনও কারণ। ততদিন পর্যন্ত দিঘার সেই ঢেউ যেন বয়ে নিয়ে চলেছে এক অজানা প্রশ্ন—যার উত্তর খুঁজছে গোটা রাজ্য।