গরমের দাপটে নাজেহাল দক্ষিণবঙ্গবাসীর জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর শোনাল আবহাওয়া দফতর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঝড়-বৃষ্টি শুরু হতে পারে। এর সঙ্গে থাকবে বজ্রপাত এবং দমকা হাওয়া, যা কিছুক্ষণের জন্য হলেও তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি থেকে রেহাই দেবে। তবে একইসঙ্গে এই আবহাওয়ার পরিবর্তন নতুন করে সতর্কতাও জারি করেছে প্রশাসন।
আবহাওয়া দফতরের মতে, বর্তমানে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প রাজ্যের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। সেই সঙ্গে একটি সক্রিয় নিম্নচাপ ঘূর্ণাবর্ত ও ট্রফ লাইনের প্রভাব রয়েছে দক্ষিণবঙ্গের উপর। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যার ফলেই বজ্রঝড় ও বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আবহাওয়া সাধারণত গ্রীষ্মের শুরুর দিকে দেখা যায়, যা বাংলায় কালবৈশাখী নামে পরিচিত।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা সহ দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও ঝড়ের তীব্রতা বেশি হতে পারে এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কিছু এলাকায় তা ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্তও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরে দক্ষিণবঙ্গে তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অনেক জায়গায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এর ফলে গরমের পাশাপাশি আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তিও বেড়ে যায়। বিশেষ করে শহর কলকাতা এবং আশপাশের এলাকায় ‘হিউমিড হিট’ বা আর্দ্র গরমের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস কিছুটা স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকায় সাধারণ মানুষকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। খোলা জায়গায় না থাকা, বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং বিদ্যুতের খুঁটি বা তারের কাছাকাছি না যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে গাছ উপড়ে পড়া বা হোর্ডিং ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গ্রামাঞ্চলে চাষের জমিতে কাজ করা কৃষকদের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। একইভাবে মৎস্যজীবীদেরও সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ ঝড়ের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনের তরফে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এই আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে শহরাঞ্চলেও প্রভাব পড়তে পারে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় জল জমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা যান চলাচলে সমস্যা তৈরি করতে পারে। অফিসযাত্রীদেরও দুর্ভোগ বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে অনেকেই মনে করছেন, এই সাময়িক অসুবিধার বদলে গরম থেকে যে স্বস্তি মিলবে, সেটাই বড় বিষয়।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ঝড়-বৃষ্টির পরিস্থিতি একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আগামী কয়েকদিন ধরে মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। যদিও প্রতিদিন একই মাত্রার ঝড় বা বৃষ্টি হবে না, তবে আকাশ মেঘলা থাকবে এবং বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা বজায় থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার ধরনেও কিছুটা অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে কালবৈশাখী হতো, এখন তা কখনও আগে বা পরে দেখা যাচ্ছে এবং অনেক সময় এর তীব্রতাও বেশি হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের আবহাওয়া আরও ঘনঘন দেখা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও সচেতন হওয়া জরুরি। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখা, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনো এবং ঝড়ের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা—এই বিষয়গুলো মেনে চললে বিপদের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দক্ষিণবঙ্গে আবহাওয়ার এই হঠাৎ পরিবর্তন একদিকে যেমন তীব্র গরম থেকে স্বস্তি এনে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েকদিনে এই আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং তা সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে।