বেহালায় ইডির অভিযান: বন্ধ গেট, কুকুরের পাহারা, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তল্লাশি—নির্বাচনের মুখে চাঞ্চল্য

কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ সামনে রেখে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। তার মধ্যেই রবিবার ভোরবেলা শহরের একাধিক জায়গায় হঠাৎ তৎপর হয়ে ওঠে Enforcement Directorate (ইডি)। বালিগঞ্জ থেকে বেহালা—একযোগে বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়। আর সেই অভিযানের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে বেহালার একটি বাড়ি, যেখানে ঢুকতেই প্রথমে সমস্যায় পড়তে হয় তদন্তকারী সংস্থাকে।
সূত্রের খবর, বেহালার ওই বাড়িটি একটি বেসরকারি নির্মাণ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এক প্রভাবশালী ব্যক্তির। রবিবার সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে ছ’টার মধ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে সেখানে পৌঁছন ইডির আধিকারিকরা। কিন্তু বাড়ির সামনে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন, অভিযান সহজ হবে না। বিশাল লোহার গেটটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। শুধু তাই নয়, বাড়ির ভিতরে ছাড়া ছিল একাধিক কুকুর, যার কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফলে বাড়ির বাইরে প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ইডি-কে। ওই সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন, যাতে কোনও প্রমাণ নষ্ট করা বা কেউ পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও কৌতূহল বাড়তে থাকে—সকাল সকাল কী এমন ঘটল যে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এসে হাজির!
অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর গেট খোলা হয়। এরপর ইডির দল ভিতরে প্রবেশ করে এবং শুরু হয় বিস্তারিত তল্লাশি। বাড়ির প্রতিটি ঘর, আলমারি, অফিসঘর—সব কিছু খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি উপস্থিত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয় বলে জানা গেছে।
এই তল্লাশির পেছনে রয়েছে একটি পুরনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, যার সূত্র ধরেই তদন্ত এগোচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, একটি বহুল আলোচিত অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে এই ঠিকানার যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে আগেই। সেই কারণেই ফের এই বাড়িতে অভিযান চালানো হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এর আগেও একই জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একাধিকবার তলব করা হলেও তিনি হাজিরা দেননি—এমনটাই দাবি তদন্তকারী সূত্রের।
এই অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তথাকথিত “সোনা পাপ্পু” নামে পরিচিত এক ব্যক্তির নামও, যিনি একটি বড় আর্থিক দুর্নীতির মামলায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছেন। যদিও তাকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি, তবুও বিভিন্ন সূত্রে তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উপর নজরদারি চালাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থা। বেহালার এই বাড়িটি সেই তদন্তেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
রবিবারের অভিযানে শুধু বেহালাই নয়, কলকাতার আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও তল্লাশি চালানো হয়। বালিগঞ্জের একটি আবাসনেও ইডির উপস্থিতি দেখা যায়। সব মিলিয়ে শহর জুড়ে একযোগে এই তল্লাশি কার্যত চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই কেন্দ্রীয় সংস্থার সক্রিয়তা বাড়ছে—এমন অভিযোগ আগেও উঠেছে। বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি, এই ধরনের অভিযান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। যদিও ইডির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তারা শুধুমাত্র তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত চালাচ্ছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, এত বড় মাপের অভিযান এই এলাকায় আগে খুব কমই দেখা গেছে। সকালবেলা হঠাৎ এত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী দেখে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
তদন্তকারীদের একাংশের মতে, এই ধরনের অভিযানে সময় লাগা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ নথি বা ডিজিটাল প্রমাণ লুকিয়ে রাখা হয়, যা খুঁজে বের করতে ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। বেহালার ক্ষেত্রেও সেই কারণেই দীর্ঘক্ষণ ধরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে অনুমান।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তল্লাশি এখনও চলছে এবং বেশ কিছু নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এখনও পর্যন্ত বড় কোনও উদ্ধার বা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও তদন্তকারীরা নিশ্চিত—এই অভিযানের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষিতে কলকাতায় ইডির এই ধারাবাহিক অভিযান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই ক্ষেত্রেই বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এখন দেখার, এই তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং আদৌ নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these